আইনি সহায়তায় এগিয়ে ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড, উপকৃত হাজারো মানুষ

প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, মে ৫, ২০২৬

আইনি সহায়তায় এগিয়ে ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড, উপকৃত হাজারো মানুষ

Manual3 Ad Code

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
অর্থের অভাবে যখন অনেকেই আদালতের দোরগোড়ায় পৌছাতে পারেন না, তখন নীরবে তাদের পাশে দাড়াচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের লিগ্যাল এইড সেবা। যাদের কাছে বিচার একসময় ছিল স্বপ্নের মতো দূর, আজ তাদেরই চোখে এখন নতুন আশার আলো ন্যায়বিচারের স্বপ্ন। জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থিত লিগ্যাল এইড অফিসে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ।

 

পারিবারিক কলহ, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, প্রতারণা কিংবা দেনা-পাওনার জটিলতা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুজতে এখানে আসছেন তারা। অর্থাভাবে আদালতে মামলা পরিচালনার সামর্থ্য না থাকলেও লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পেয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। সরকারি এই সেবার আওতায় আইনজীবী নিয়োগ থেকে শুরু করে মামলা পরিচালনার যাবতীয় ব্যয় বহন করা হচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষও এখন নির্ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন, যা বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

 

লিগ্যাল এইড অফিস থেকে মূলত তিন ধরনের সেবা প্রদান করা হয়, বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ, আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি। এর মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে বসেই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। যা সময় ও খরচ উভয়ই কমায় এবং সম্পর্ক বজায় রাখতেও সহায়ক।

 

কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড অফিসে মোট ৮১৪টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৭১৪টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই সময়ে উপকারভোগীর সংখ্যা দাড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৩৬ জনে। মামলা দায়ের করা হয়েছে ২২৫টি। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপসের ফলে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আদায় হয়েছে। এছাড়া ৭০৩ জন ব্যক্তি বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। একই সময়ে আদালতে বিচারাধীন ১৯১টি মামলা আপসের মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ৮টি ক্ষেত্রে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌছে দিতে জেলার ৫টি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি-ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আইনি সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভা ও মতবিনিময় সভা করেছেন লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মজনু মিয়া।

 

উপকারভোগী আব্দুল করিম বলেন, আমি গরিব মানুষ। ভ্যান চালিয়ে যা আয় করি, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে। কোর্ট-কাচারি, মামলা-মোকদ্দমা এসব আমার মতো মানুষের কাছে সবসময়ই ভয় আর দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল। আমি কখনো ভাবিনি একজন সাধারণ মানুষও আইনের কাছে দাড়িয়ে ন্যায়বিচার পেতে পারে। লিগ্যাল এইড আমাকে সাহস দিয়েছে, আমার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ আমি শুধু জমিই ফিরে পাইনি, আইনের ওপরও আমার বিশ্বাস ফিরে পেয়েছি।

 

Manual8 Ad Code

সদর উপজেলার এক নারী ভুক্তভোগী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। পরে লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে আইনি সহায়তা দেয়। এখন আমি ন্যায়বিচারের আশায় আছি।

 

পীরগঞ্জ উপজেলার মালেক বলেন, জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। মামলা করার সামর্থ্য ছিল না। লিগ্যাল এইডে যাওয়ার পর তারা বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছে। এখন আমি স্বস্তিতে আছি।

 

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাফিদ, শিমুল, শাজারিয়ার ও জান্নাতি বলেন, আগে আমরা ভাবতাম আইন আর আদালত শুধু বড়লোক বা প্রভাবশালী মানুষের জন্য। কিন্তু লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম দেখে এখন বুঝতে পারছি, সাধারণ মানুষও আইনের কাছে গিয়ে ন্যায়বিচার পেতে পারে। স্কুলে ও বিভিন্ন সভায় এসব বিষয় জানার পর আমাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তৈরি হচ্ছে।

 

Manual1 Ad Code

ঠাকুরগাঁও সদরের আকচা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য নীবব পাল বলেন, লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের এলাকার সাধারণ মানুষ এখন খুব সহজেই আইনি সহায়তা পাচ্ছেন। আগে যেসব মানুষ অর্থের অভাবে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারতেন না। তারা এখন বিনামূল্যে ন্যায়বিচারের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে গ্রামীণ পর্যায়ে বিরোধ কমছে এবং মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা বাড়ছে।

Manual6 Ad Code

 

এ বিষয়ে লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মজনু মিয়া বলেন, আমরা মূলত দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তার আওতায় আনতে কাজ করছি। কেউ মামলায় জড়িয়ে পড়লে এবং আর্থিকভাবে মামলা পরিচালনায় অক্ষম হলে সরকারিভাবে আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে মামলা পরিচালনা করা হয়।

 

তিনি আরও বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা যেমন দেনমোহর ও ভরণপোষণ এবং আপসযোগ্য ফৌজদারি মামলাগুলো আমরা দুই পক্ষকে নিয়ে বসে মীমাংসা করি। এতে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় এবং মানুষও উপকৃত হন।

Manual1 Ad Code

 

(সুরমামেইল/এমআই)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code