দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ আজ

প্রকাশিত: ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২৬

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ আজ

Manual5 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

Manual1 Ad Code

 

সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়া।

 

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট।

 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

Manual3 Ad Code

 

প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে।

 

এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।

 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

 

সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

 

এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরো ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে।

 

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

Manual5 Ad Code

 

তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

 

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”

 

ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা
বিশাল অংকের এই বাজেটের খরচ সামলাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রধান অংশ (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা) আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকেই সোয়া লাখ কোটি টাকার (১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা) বেশি ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে।

Manual6 Ad Code

 

মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথাগত বড় অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে কার্ডভিত্তিক বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির সম্প্রসারণসহ ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে এই বাজেটে।

 

ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য মেগা ধামাকা
নতুন বাজেটে প্রযুক্তিবান্ধব ফ্রিল্যান্সার এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের সুখবর ও বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব থাকছে। তরুণ ও যুবসমাজকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য থাকছে ২ হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল।

 

কর কাঠামো ও শুল্কে বড় পরিবর্তনের আভাস
সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের উৎসে কর কমানোসহ বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে। তবে, ধনীক শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা বা সারচার্জ বাড়তে পারে।

 

ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম পে-স্কেল’ বা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।

 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ
চলতি বছরের মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে; সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, এই বিশাল অঙ্কের বাজেট বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কঠোর বাজার মনিটরিং এবং সঠিক মুদ্রানীতির সুষম সমন্বয় ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code