সিলেট ২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৪
জৈন্তাপুর প্রতিনিধি :
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় বড়গাং নদীর ইজারাকৃত সীমানার বাহির ও বেড়ীবাঁধ সংলগ্ন ১৮০ ফুট ভিতর স্থান হতে বালু উত্তোলনের ফলে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াপদা বেড়ীবাঁধের তিন কিলোমিটার এলাকা। বালু উত্তোলনে কারনে ১কিলোমিটার এলাকা ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। চরম শংঙ্কায় দিন কাটছে বেঁড়ীবাধের ভিতরে বসবাসরত লক্ষাধিক মানুষ।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজপাট ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষিপ্রাসাদ গ্রামের ফেরীঘাট বড়গাং ব্রীজ হতে ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বালু উত্তোলন করছে শ্রমিকরা। বাঁধের অংশ জুড়ে বালু উত্তোরনের কারনে ১ কিলোমিটার এলাকা ধসে পড়েছে।
স্থানীয সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সারী গোয়াইন বেড়ীবাঁধ প্রকল্পের নামে বড়গাং ও সারীনদী সংলগ্ন ১৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বেঁড়ীবাধ নির্মান করা হয়। বেঁড়ীবাধটি নিজপাট ইউনিয়ন ও জৈন্তাপুর ইউনিয়নে ৭টি ওয়ার্ডের মানুষের বসতভিটা ও আবাদি জমি পাহাড়ি ঢলের সৃষ্ট বন্যা হতে নিরাপদ রাখার জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
কিন্তু ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্কারী বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ফেরিঘাট ব্রীজের ২০০ মিটার পশ্চিমে ও ব্রীজের ৫০ গজ পূর্বে বিশাল ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। যার ফলে বাঁধের ভিতরে বসবাসকারী মানুষের ঘরবাড়ীর ব্যfপক ক্ষতির পাশাপাশি শত শত গবাদিপশুর প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে।
পরবর্তীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সংস্কার ১৯৯০ সালে পূর্ব লক্ষিপ্রসাদ গ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ১ কিলোমিটার অংশজুড়ে মাটির সাথে বড় বড় বোল্ডার পাথর দিয়ে শক্ত ও মজবুদ ভাবে বাঁধ পুণনির্মাণ করা হয়।
বেড়ীবাঁধের ঠিক বিপরীত দিকে বড়গাং এলাকায় খাস ভূমি হতে বালু উত্তোলন ও বিক্রি অনুমতি থাকলেও বাঁধের নিরাপত্তার স্বার্থে বাঁধ হতে ১৮০ ফুট পর্যন্ত সকল প্রকার বালু উত্তোলনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিগত ৮/১০ বছর ধরে বড়গাং বালু ব্যবসায়ীদের একটি কুচক্রী মহল অতিরিক্ত মুনাফার আশায় পূর্ব লক্ষিপ্রসাদ এলাকায় বাঁধ সংলগ্ন স্থানে ১৮০ ফুটের মধ্য হতে বালু সংগ্রহ শুরু করে। ফলে বাঁধের ১ কিলোমিটার এলাকার এলাকার মাটি সরে গিয়ে পাথরের শক্তবাঁধটি ধসে পড়তে শুরু করেছে এবং শ্রমিকেরা রাতের আধারে বাঁধের সেই পাথরগুলো গোপনে নৌকা যোগে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসনাত বলেন, বড়গাং এলাকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় বাঁধের ১৮০ ফুটের ভিতর থেকে বালু ও পাথর চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে পূর্ব লক্ষীপ্রসাদ গ্রামের বাঁধের প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকার বড় অংশ ভেঙ্গে গেছে। প্রতি বছর সারী-গোয়াইন নদীতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের কারনে ভাঙ্গনের পরিমান আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে বেড়ীবাঁধ এলাকার কয়েক হাজার পরিবার।
পূর্ব লক্ষীপ্রাসাদ গ্রামের ইসমাইল আলী নেকই বলেন, দুই বছর আগে গ্রামের সকল লোকজন বাধ্য হয়ে বালু উত্তোরনের নৌকা আটক করে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তারপর হতে কুচক্রী মহল নানা ভাবে হুমকি প্রদান করে আসছে। তিনি বলেন, এভাবে বালু উত্তোলন ও পাথর চুরি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে বেড়ীবাঁধ এই অংশটি যে কোন সময় ভেঙে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আবদুল লতিব বলেন, ২০১৭/১৮ সালে বেড়ীবাঁধ রক্ষার প্রতিকার চেয়ে উপজেলা প্রশাসন নিকট লিখিত ভাবে অভিযোগ দায়ের করি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌরিন করিম সরজমিনে বাঁধের দূরাবস্থা দেখে ১৮০ ফুট পর্যন্ত নদীর অংশে লাল নিশানা টাঙ্গীয়ে দেন এবং নিশানার ভিতরের অংশ হয়ে সব ধরনের বালু উত্তোলন ও পাথর চুরির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু কয়েক মাস বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পুনরায় রাতের আধারে সক্রিয় হয়ে উঠে বালু ও পাথর খেকু চক্রটি।
আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, বহুবার এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিষেধ দেওয়ার পরও তারা কর্ণপাত করেছে না। এই চক্রের সাথে জড়িত স্থানীয় ব্যবসায়ী জমির মোল্লা, আমিন মিযা, শেখর বাবু, রফিকুল, রুহুল আহমদ ও আনাইছ মিয়া সহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। স্থায়ী প্রতিকার চেয়ে পূর্ব লক্ষীপ্রাসাদ গ্রাম সহ পাশ্ববর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষদের স্বাক্ষরসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েকমাস পূর্বে মো ইসমাইল আলী নামক এক ব্যাক্তিতে বড়গাং বালু মহাল ইজারা নেন। তখন থেকে বেড়ীবাঁধ সংলগ্ন স্থান হতে বালু উত্তোলনে বেপরোয়া হয়ে ওঠে চক্রটি।
গত ২১ সেপ্টেম্বর পূর্ব লক্ষীপ্রাসাদ গ্রামে বেড়ীবাঁধ এলাকা থেকে বারকি শ্রমিকরা বালু উত্তোলন করতে গেলে গ্রামবাসীর সাথে তারা বাকবিতন্ডায় জড়ায়। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষ বিবাধে জড়ানোর উপক্রম হলে স্থানীয় মুরুব্বিদের হস্তক্ষেপে উভয় পক্ষকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে সে স্থানে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বড়গাং বালু মহালের ইজারাদার ইসমাইল মিয়া বলেন, বেড়ীবাঁধ সংলগ্ন এরিয়া হতে বালু উত্তোলনের কোন সম্পৃক্ততা বা নির্দেশনা ইজারাদার কর্তৃপক্ষের নেই। এতে কেউ জড়িত থাকলে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারবে।
এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রিয়াজ পারভেজের সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে জানান, আমি ছুটিতে আছি। কোন অভিযোগ তার কার্যালয়ে আসলে তিনি প্রয়োজন ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।
জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালিক রুমাইয়া বলেন, পূর্ব লক্ষীপ্রাসাদ গ্রাম ও পাশ্ববর্তী এলাকার প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে তার দপ্তরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। উক্ত বিষয়ে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারী প্রকৌশলী ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদারকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রহন করা হবে বলে জানান।
(সুরমামেইল/জেআই)
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি