৩১ ঘণ্টায় ৪ বার ভূমিকম্প, কী বার্তা দিচ্ছে?

প্রকাশিত: ১১:০১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২৫

৩১ ঘণ্টায় ৪ বার ভূমিকম্প, কী বার্তা দিচ্ছে?

Manual7 Ad Code

সুরমামেইল ডেস্ক :
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু করে শনিবার (২২ নভেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ধারাবাহিক কম্পন ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন সতর্কবার্তা-বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

 

দুই সেকেন্ডে রাজধানীতে দুটি ভূমিকম্প
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকায় পরপর দুটি ভূমিকম্প হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, প্রথমটি অনুভূত হয় সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৭। এর এক সেকেন্ড পর ৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩।

 

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল বাড্ডায়। আর ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে।

 

এরআগে একইদিন সকালে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়।


।আরও পড়ুন:


শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। এতে শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। আতঙ্কে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়া, ভবন হেলে যাওয়া ও ফাটল সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি- ৫ জন নিহত হন নরসিংদীতে; ঢাকায় মারা যান ৪ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ১ জন।

 

পরপর ৪ ভূমিকম্প কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো একটি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। ভূতাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশ একটি সক্রিয় প্লেট সীমান্তে অবস্থান করছে, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের কম্পন ঘটতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটো। এর একটি হলো ‘ডাউকি ফল্ট’, যা ভারতের শিলং মালভূমির পাদদেশে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ-জামালগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে বিস্তৃত যা প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ।

 

আরেকটি হলো- সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, টেকনাফ পর্যন্ত যা সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উৎসটিকে খুব ভয়ংকর বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

Manual8 Ad Code

টেকটনিক প্লেটে বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে- পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট আর পূর্ব দিকে বার্মা প্লেট। আর বাংলাদেশের উত্তরদিকে আছে ইউরেশিয়ান প্লেট।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার গণমাধ্যমে বলেন, ভারতীয় প্লেটটি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে অর্থাৎ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটা সাবডাকশান জোনের তৈরি হয়েছে। আর নটরিয়াস (ভয়ংকর অর্থে) এই জোনের ব্যাপ্তি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল এর মধ্যে পড়েছে। এখানে বিভিন্ন সেগমেন্ট আছে। আমাদের এই সেগমেন্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে। এটা বের হতেই হবে।’

 

তার মতে, নরসিংদীর মাধবদীতে যে ভূমিকম্পের উৎস ছিলো সেই এই সেগমেন্টেরই এবং নরসিংদীতে দুই প্লেটের যেখানে সংযোগস্থল, সেখানেই ভূমিকম্প হয়েছে।

 

অধ্যাপক হুমায়ুন বলেন, ‘এখানে প্লেট লকড হয়ে ছিল। এর অতি সামান্য ক্ষুদ্রাংশ খুললো বলেই শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে। এটিই ধারণা দেয় যে সামনে বড় ভূমিকম্প আমাদের দ্বারপ্রান্তে আছে।’

 

Manual3 Ad Code

তিনি আরও বলেন, ‘এই যে বড় একটি প্লেট বাউন্ডারির খুব ক্ষুদ্র শক্তি খুলে গেলো তার মানে হলো সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ একটু খুলে যাওয়া কিছু শক্তি বের হওয়ায় সামনে এই শক্তির বের হওয়া আরও সহজ হয়ে গেছে।’

 

আগের বড় ভূমিকম্পের নজির
বাংলাদেশ ও আশপাশের এই অঞ্চলে আগেও ৮ মাত্রার ওপরে বড় ভূমিকম্প হয়েছে

  • ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প
  • ১৭৬২ সালে টেকনাফ-মিয়ানমার অঞ্চলে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প
  • ১৭৯৭ সালে ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া
  • ১৮৬৮ ও ১৯২২ সালে সিলেট-মৌলভীবাজার অঞ্চলে ৭.৫ ও ৭.৬ মাত্রার বড় ভূমিকম্প

এই ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়- অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্পপ্রবণ।

 

কেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ঢাকা?
বিশেষজ্ঞদের মতে- ঢাকার অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত নয়। অতিরিক্ত ঘনবসতি ও সংকীর্ণ রাস্তার পাশাপাশি উদ্ধার ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। তাই বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা এই শহরেই।

 

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘মাধবদীর ভূমিকম্প দেখাচ্ছে বড় শক্তি বেরিয়ে আসার পথ খুলছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে।’

 

Manual2 Ad Code

ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের ভবনগুলোর জরুরি অডিট, বিল্ডিং কোড প্রয়োগ, উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি- সবই এখন সময়ের দাবি।

 

সতর্কবার্তা স্পষ্ট-৩১ ঘণ্টায় ৪ দফা কম্পন জানাচ্ছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে এবং বড় কম্পনের সম্ভাবনাকে আর হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

 

(সুরমামেইল/এফএ)

Manual2 Ad Code


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code