‘বাকস্বাধীনতা’ যেন ‘বাকশালীনতার’ সীমা লঙ্ঘন না করে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ১:২৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬

‘বাকস্বাধীনতা’ যেন ‘বাকশালীনতার’ সীমা লঙ্ঘন না করে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

Manual3 Ad Code

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত


মেইল ডেস্ক:
‘গালাগালি সংস্কৃতির’ বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

 

সরকারপ্রধান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনকালে জনগণের সব গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে, বাকস্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।

 

তারেক রহমান বলেন, কোনো বিবেকবান মানুষ বা দেশপ্রেমিক রাজনীতিক চান না, রাজনৈতিক সংস্কৃতি গালাগালিতে পরিণত হোক। এ জন্য দলমত–নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পারিবারিক পরিবেশে যেসব কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, জনপরিসরে কেন সেসব শব্দ ব্যবহার করব? গালাগালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা নিতে হবে।

 

এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সমর্থন জানান।

 

এদিন বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশন সমাপনীসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনান। রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল সবাই মিলে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।

 

জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে ও শহীদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

 

তিনি বলেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংসদকে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে চায় সরকার। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সংসদে আলোচনা করে জনগণের সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

 

গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণে জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সচেতন। এ সমস্যা হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস তোলার চেষ্টা করা হয়নি। বঙ্গোপসাগরের দুই পাশে প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র থেকে গ্যাস তুললেও বাংলাদেশ অংশে এক যুগের বেশি সময় গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা হয়নি।

 

তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া ছিল বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। ফলে দেশকে জ্বালানি আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, সরকার গঠনের ১০-১২ দিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এতে তেল ও গ্যাস আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের দুটি এফএসআরইউর একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এবং সেটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে দেশের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

 

দেশের জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দাবিতে গত শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লং মার্চ করে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যা সমাধানে বিরোধীদলীয় বন্ধুদের সহযোগিতা আশা করেছিল সরকার। গাড়িবহরের লং মার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই সবচেয়ে আগে লং মার্চের আয়োজন করত।

 

তিনি বলেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি বাড়ানো ও ব্যাংকের লেনদেনের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছিল। ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সরকারও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে কুইক রেন্টাল বসিয়েছিল। এর মাধ্যমে কিছু মানুষকে সুবিধা দেওয়া হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

Manual2 Ad Code

 

Manual5 Ad Code

বর্তমান সরকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি দুটি এফএসআরইউ ও দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি নষ্ট হয়ে গেছে। এসব সমস্যা বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল সবাই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।

 

তারেক রহমান বলেন, জনগণের সামনে বিদ্যমান পরিস্থিতি তুলে ধরা সংসদের প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সঠিক চিত্র ও বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। প্রকৃত পরিস্থিতি সঠিকভাবে উপস্থাপন না করা হলে পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্রই লাভবান হবে।

 

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের সঙ্গে এ সমস্যা সমাধান করতে সরকার সক্ষম হবে।

Manual5 Ad Code

 

তিনি বলেন, এতদিন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিল। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু গ্রাহক নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হবে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি যতবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, ততবারই দেশকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি সংকটে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি দেশের হাল ধরেছে এবং সফল হয়েছে।

 

অর্থনীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে একটি চক্র জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দেশ ছাড়ার আগে পর্যন্ত তাদের দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট ও টাকা পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে। এই ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার দায়িত্ব এখন বিএনপির কাঁধে।

 

তিনি বলেন, যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, তারা বাংলাদেশের কাঁধে ঋণ রেখে গেছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে ঋণখেলাপির অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিগত নির্বাচনের পরে যা ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

 

তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিস্ট চক্রের অনাচার, লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণখেলাপির কলঙ্ক থেকেও বাংলাদেশকে মুক্ত করা হবে।

Manual6 Ad Code

 

তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র পেয়েছে বর্তমান সরকার। যারা বাংলাদেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছে, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে; কিন্তু সেই ঋণ এখনো বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। তবে দেশের কাঁধে এখনো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ রয়েছে।

 

(সুরমামেইল/এমকে)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code