সিলেট ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় প্রধান আসামি পুলিশের বহিষ্কৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এছাড়া আরও দুই আসামির যাবজ্জীবন এবং তিন আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন বিচারক।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকালে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের সরকারি কৌঁসুলী (পিপি) মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন। তিনি বলেন, আদালত ছয় আসামির মধ্যে আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। অন্য পাঁচ আসামির মধ্যে কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ, টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়াও পুলিশের এসআই মো. হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী ও সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি তাদের পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে সিলেট নগরীর আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে (৩৪) বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে এনে নির্যাতন করেন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াসহ পুলিশ সদস্যরা। পরদিন সকালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে নিহত রায়হানের মরদেহে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯৭টি ফোলা আঘাত ও ১৪টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পান চিকিৎসকরা।
এ ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হানকে নির্যাতনের সত্যতা পায়।
এ ঘটনায় ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ওই বছরেই ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।
তারপর পুলিশি হেফাজত থেকে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রধান আসামি আকবরকে ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন।
কিন্তু গত বছরের ১০ অগাস্ট উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন পান। পরদিন তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পান। পরে তার জামিন স্থগিত করা হলেও তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন।
২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলায় পাঁচ পুলিশসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক আওলাদ হোসেন।
অভিযোগপত্রে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে (৩২) প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন- এএসআই আশেক-ই-এলাহী (৪৩), কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ (৩২), টিটু চন্দ্র দাস (৩৮), ফাঁড়ির ‘টু-আইসি’ পদে থাকা এসআই মো. হাসান উদ্দিন (৩২) ও এসআই আকবরের আত্মীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান (৩২)।
এদিকে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার আগে আদালত প্রাঙ্গনে আসেন নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম।
এ সময় আসামিরা জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৬ বছর পর রায় ঘোষিত হবে। কিন্তু এই রায় শুনে আমি কি করব। আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মারছে তারা তো পালিয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার থাকতে একজনের জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার আর্গুমেন্ট শেষ হওয়ার পরও কিভাবে প্রথম তিনজন আসামিই জামিন পায়..? জামিন পেয়ে কিভাব তারা পালিয়ে যায়..?
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আজকে তো শুধু কাগজে কলমে রায় হবে, আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে তো আমার ৬ বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে গেল।’
পিপি মুমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, ‘আলোচিত এই হত্যা মামলার ৬ আসামির মধ্যে কেবল পুলিশের বহিস্কৃত এএসআই আশেক-ই-এলাহী কারাগারে আছেন। বাকিরা আসামিরা পলাতক। রায় ঘোষণার আগে কারাগারে থাকা মামলা একমাত্র আসামি এলাহীকে আদালতে আনা হয়।”
মামলার রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট। তবে আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।’
(সুরমামেইল/এমএকে)
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি