হাওরে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে কাটা ধান, ব্যাপক ক্ষতির মুখে কৃষকরা

প্রকাশিত: ১:০৪ পূর্বাহ্ণ, মে ৫, ২০২৬

হাওরে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে কাটা ধান, ব্যাপক ক্ষতির মুখে কৃষকরা

Manual7 Ad Code

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সুনামগঞ্জের কৃষকেরা। নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানের পাশাপাশি পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তারা। আয়ের একমাত্র ভরসা ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক পরিবার।

Manual7 Ad Code

 

সোমবার (৪ মে) সকালে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে ঘুরে দেখা যায়, হাওরটির অর্ধেকের বেশি এলাকা পাকা ও কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির উঁচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের বিল ও জলাশয় থেকে কচুরিপানা ভেসে এসে ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসের টানে এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়ানো কচুরিপানায় পুরো হাওর এখন ঢেকে গেছে।

 

এ চিত্র দেখে কোথায় ধানক্ষেত আর কোথায় জলাশয়-তা আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই।

 

এভাবে অন্যান্য হাওরের পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসল নিয়েও আশা ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকরা। এখন পর্যন্ত যতটুকু ধান কাটতে পেরেছেন, সেটুকুতেও অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। সেই ধান রক্ষায় শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু তাই নয়, গবাদিপশুর একমাত্র খাদ্য খড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি আবার কখনও রোদ-এমন অনিশ্চিত আবহাওয়ায় ধান ও খড় শুকাতে পারছেন না। এতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

 

দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশের হাসন বসত গ্রামের কৃষক ছাদ মিয়া বলেন, ‘আট কেয়ার জমিতে আবাদ করছিলাম। থোর আওয়ার সময় (ধানের শীষ বের হওয়ার আগে) তলাইয়া নিছে। বাকি চার কেয়ার কাটছিলাম, কিন্তু অনেক ধানে গ্যাড়া (অঙ্কুর) এসে নষ্ট হয়ে গেছে। এই হাওরের উত্তাল পানিতে আরও এক কেয়ার জমির ধানও গ্যাছে।’

 

“এ অবস্থায় চার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী আর দুই নাতি মিলে আটজনের পরিবারের ভরণ পোষণ কীভাবে টানবেন সে চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে কৃষক ছাদ মিয়ার।”

 

তার পাশেই দেখা গেল কাটা ধানের স্তুপ থেকে অঙ্কুরিত ধান বাছাই করছেন তার স্ত্রী জমিলা খাতুন। পচে যাওয়া খড় দেখিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধানের সঙ্গে খড়ও নিয়ে গেল। এখন চারটা গরুকে কীভাবে বাঁচাব?’

 

ফিরে যাচ্ছেন শ্রমিকরা, ঝুঁকিতে হাওরের ধান কাটা

সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে গিয়ে দেখা যায় এক বিষন্ন দৃশ্য।

 

Manual3 Ad Code

সদর উপজেলার আচিনপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল ধানকাটা শ্রমিক ধান কাটার উদ্দেশে হাওরে যাচ্ছেন। তারা হাসনবসত গ্রামের আছলাম মিয়ার ধান প্রতি বিঘা ৮০০ টাকা মজুরিতে কাটার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন।

 

কিন্তু ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরেই তারা ফিরে আসেন। সেখানে দেখা যায়, কৃষকের ধান পুরোপুরি পানিতে ডুবে গেছে। এখন ধান কাটতে হলে কোমর পর্যন্ত পানিতে নামতে হবে; যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই তারা ধান না কেটেই ফিরে আসেন।

 

এদিকে ওই এলাকার যেসব জমি তীরের কাছাকাছি ছিল এবং এখনো কিছুটা ভেসে ছিল সেগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে সেগুলোও আর কাটার উপযোগী অবস্থায় নেই।

 

ধানকাটা দলের সরদার নজরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘ধান কাটতে অইলে গলাপানিত নামতো অইবো। ক্ষেত দেইখ্যা ভয় করে, তাই ফিইর‌্যা আইছি। ধান কাটাত নামলে জান্দা (ঠান্ডা) পানিত অসুখ অইবো। ক্ষেতেই অবস্থা দেইখ্যা কোনও ‘বেফারি’ ধান কাটতে চায়না।’

 

কালিপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক সাদিকুর রহমান বলেন, ‘অসুস্থ হওয়ার পর পিত্ততলির অপারেশন করাইছি। ধার দেনা করে আড়াই কেয়ার জমিনো ধান লাগাইছলাম। দুই কিয়ারই পানির তলে। আধ কেয়ার কাটলেও এখন গ্যাড়া আইয়া নষ্ট করিলিছে। তলাইয়া যাওয়া ধান আর কাটার উপায় নাই। কামলা আইয়া ফিইরা যারগি। কেউ কাটতো চায়না গলাপানির ধান।’

 

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি সোমবার সকালে ৪ দশমিক ৮৭ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।

 

ধান মাড়াইয়ে এবার বড় লোকসান

Manual1 Ad Code

এদিকে শুধু কৃষকের ধানই তলিয়ে যায়নি। ধান মাড়াই করতে যে যন্ত্র বা ‘বোমা মেশিন’ আছে তার চালক ও মালিকরাও এবার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বৈশাখী তোলার জন্য প্রতিটি যন্ত্রের মালিক ১৫-২০ হাজার টাকা করে খরচ করে মেশিনগুলো সচল করেছিলেন।

 

কোনও মালিকই এবার ২০-৩০ মণের ধান সংগ্রহ করতে পারেননি। অথচ অন্যান্য বছর প্রতিটি মেশিন অন্তত ১০০ মন ধান সংগ্রহ করতে পারতো মাড়াই করে।

 

কালিপুর গ্রামের ধান মাড়াই মেশিনের মালিক সিরাজ মিয়া বলেন, ‘অন্যান্যবার ১০০ থেকে ৮০ মণ ধান রুজি করতে পারতাম। এবারও ২০ হাজার টেকা খরচ কইরা মেশিন ঠিক করছিলাম। এখন পর্যন্ত ৩০ মণ ধানও তোলতাম পারিনি। গিরস্তু ধান তোলতে পারছে না, আমরা কোয়াই তনি পাইমু?’

 

কালিপুরের মেশিন চালক চান মিয়া বলেন, ‘একটা মেশিন চালাইতে কম পক্ষে তিনজন মানুষ লাগে। রাস্তা খারাপ অইলে আরো দুজন বেশি লাগে, ঠেলানোর লাগি। বছর ভালা অইলে প্রত্যেকে গড়ে ১৫ মণ ধান রুজি করতে পারে। কিন্তু এবার এখনো ১৫ মণ ধান পাইনি। আস্তা আওর ডুইব্যা নষ্ট অইয়া গ্যাছে।’

Manual6 Ad Code

 

ধানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দুপক্ষের ভিন্ন তথ্য

সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, ‘হাওরে সব মিলিয়ে ৬০ ভাগের মতো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এমনকি কাটা ধানও অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কৃষি বিভাগ প্রকৃত ক্ষতির তথ্য আড়াল করে ক্ষতি কমিয়ে দেখাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দেখানোয় কৃষকরা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবেন।’

 

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘হাওরে এখন পর্যন্ত ৭৭ ভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। হাওরে আবাদ করা ১ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টরের মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর কাটা হয়েছে। জেলায় এবার হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ৬৫.৯৩৫ শতাংশ কাটা হয়ে গেছে।’

 

২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।’

 

(সুরমামেইল/এমএইচকে)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code