সিলেট ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২৫
নবীগঞ্জে বরাক নদীর উপর নির্মিত সেতুর নিচে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বৃদ্ধ আলাউর মিয়া।
এম, এ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ :
‘হামার কী দোষ, হামার বাড়ি ঘর নাই, থাকমু ক্যানও’ বৃদ্ধ আলাউর মিয়ার (৭০) উক্তি। বাড়ি-ঘর কিছুই নাই থাকবেন কোথায়- তাই তিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে নদীর উপর নির্মিত ব্রীজের নিচে পরিবার নিয়ে তাঁর বসবাস।
নবীগঞ্জ ইউএনও অফিসে ভুমিহীন হিসাবে আবেদন কনেরনি অফিস সুত্র জানায়। তাই বাস্তুভিটাহীন বৃদ্ধ আলাউর মিয়ার পরিবারকে কোন বরাদ্ধ দেয়া যাচ্ছে না।

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রুস্তমপুর এলাকায় শাখা বরাক নদীর ওপর নির্মিত একটি সেতুর নিচে বসবাস করছেন আলাউর মিয়ার পরিবার। সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলছে অসংখ্য ভারী যানবাহন। আর নিচে চলছে জীবনের নির্মম যুদ্ধ। আবার বর্ষার মৌসুমে পানির সাথে যুদ্ধ করতে হয়। বৃষ্ট্রি ও পাহাড়ী ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে তার বসত ঘরে পানি জমে যায়। তবুও তিনি স্থান পরিবর্তন করছেন না।
সরেজমিন দেখা যায়, সেতুর নিচে বসবাস করা এ পরিবারটির জন্য প্রতিটি মুহুর্ত যেন এক মৃত্যুঝুঁকি। ছয় ফুটের মতো উঁচু-নিচু জায়গায় সামান্য পলিথিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি বাঁশের ঘরেই স্ত্রী, সন্তান, পুত্রবধ‚ নাতি-নাতনিসহ মোট ১৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করে আসছেন।
রুস্তমপুর এলাকার রহিম উদ্দিন বলেন, আলাউর মিয়া যেমন অসহায়, ভুমিহীন তেমনি আমাদের জন্য গলার কাটাও বটে, তার বাড়িটি ব্রীজের নীচে হওয়া নদীর পানি নিস্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। সরকার যদি তাকে পুনর্বাসন করে কোথায় নিয়ে যায় এলাকার জন্য অনেক উপকার হবে।
অসহায় বৃদ্ধ আলাউর মিয়া বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে বলে তিনি কোন বসত ভিটা পাচ্ছেন না, তাই সেতুর নীচে বসবাস করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘হামার কী দোষ, হামার বাড়ি ঘর নাই, থাকমু ক্যানও’ তাই নদীর তলেই আছি!

ভুমি অফিসে আবেদন করেন নি কেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি আবেদন করতে জানি না। তাই দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সেতুর নিচে জীবনের নির্মম যুদ্ধ চলছে।
তিনি বলেন, জীবনের শেষ বয়সে একটি ঘরও জোটেনি। পরিবারের কেউ লেখাপড়া করতে পারছে না। অসুস্থ হলেও ওষুধ কেনার টাকা নেই। বাঁচার জন্য প্রতিদিন লড়াই করতে হয়।
আলাউর মিয়া তিনি আশ্রয়ের খোঁজে ২০০৫ সাল থেকে পরিবারসহ ব্রিজের নিচে বসবাস শুরু করেন। দিনরাত ভারী যানবাহনের শব্দে বার বার ঘুম ভাঙে তাদের। ছোট-ছোট শিশুদের ঘুমাতে কষ্ট হয়, সবসময়ই থাকে এক অজানা আতঙ্ক। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ হয় চরম, ঘরে পানি ঢুকে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে জীবন।
পেশায় সিএনজি চালক বৃদ্ধ আলাউর মিয়ার ছেলে কামাল মিয়া বলেন, তার পরিবারের সদস্যরা অনেক কষ্টে বসবাস করছেন। অনেকবার স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছি, তবে কোনো সরকারি ঘর বরাদ্দ পাইনি।
তাদের পরিবারের প্রতিদিন খাদ্য সংকট থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, একবেলা খাবার জুটলেও অন্য বেলা অনাহারে দিন কাটাতে হয় পুরো পরিবারকে। অসুস্থ হলে টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারে না।
স্থানীয় বাসিন্দা জাবেল মিয়া বলেন, এই পরিবারটির অবস্থা দেখে চোখে পানি এসে যায়। এখনই সহযোগিতা না করলে হয়তো এই শিশুগুলোকে আমরা হারিয়ে ফেলব।
এদিকে স্থানীয়রা এই অসহায় পরিবারের পাশে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।
দেবপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের শাহরিয়াজ নাদির সুমন জানান, আমি বিষয়টি ইউএনও ও এসিল্যান্ড স্যারের কথা বলবো। পরিবারটি সরকারি ঘরের জন্য আবেদন করলে কেন এখনো বরাদ্দ সম্ভব হয়নি জানার জন্য চেষ্টা করবো। তবে এই পরিবারের বিষয়টি ইউপি অফিস ও প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
এ বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমিন বলেন, পরিবারটিকে সরকারি বন্দোবস্তের আওতায় আনার প্রক্রিয়ার জন্য আমরা পরিবারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করে আবেদন দেওয়ার জন্য বলেছি, কিন্তু এখনও কোন আবেদন দেয়া হয়নি। আবেদন দেয়া হলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের চাহিদা মোতাবেক জায়গায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ বসত ঘরের জন্য পানি নিস্কাশনের সমস্যা হলেও মানবিক কারনে উচ্ছেদ করা হচ্ছে না।

(সুরমামেইল/এফএ)
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি