ওসি মনিরের অমানবিকতার শিকার পুলিশ কনস্টেবল হারালেন দুই নবজাতক

প্রকাশিত: ১১:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২৬

ওসি মনিরের অমানবিকতার শিকার পুলিশ কনস্টেবল হারালেন দুই নবজাতক

Manual1 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
সিলেটের মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেনের চরম অমানবিক আচরণের বলি হয়েছে অনাগত দুই শিশু। সন্তানসম্ভবা অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়ে বারবার আকুতি জানানোর পরও মেলেনি ছুটি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ছুটি জোগাড় করলেও যেতে দেননি ওসি। এমনকি স্ত্রীর প্রসবব্যথা উঠলেও হাসপাতালে যেতে ছুটি মেলেনি। উল্টো মিলেছে দুর্ব্যবহার ও মারমুখী আচরণ। শেষ পর্যন্ত ওসি ছুটির অনুমোদন দিলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। দুই সন্তান আর পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেনি।

 

হৃদয়বিদারক এ ঘটনার শিকার মোগলাবাজার থানার কনস্টেবল মামুনুর রশিদ। তিনি ন্যায়বিচার ও ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানিয়ে এসএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ওসি মনিরের বিরুদ্ধে।

 

অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, কনস্টেবল মামুনুর রশিদ গত মে মাসে মোগলাবাজার থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগদান করেন। তার স্ত্রী ২৭-২৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এ নিয়ে তিনি শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ডাক্তারের দেওয়া জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য ঈদুল আজহার আগে থেকেই কনস্টেবল মামুনুর রশিদ নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ওসি মনির হোসেন তার আবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে (ফরওয়ার্ড) অস্বীকৃতি জানান। ছুটির জন্য বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করলে ওসি রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘বাড়িতে মা-বাবা নাই? তারা চিকিৎসা করাবে। আপনার সাহস কত বড় যে বারবার আমার রুমে আসেন!’ এরপর মুন্সিকে ডেকে তাকে রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়।

 

Manual8 Ad Code

পরবর্তী সময়ে এসএমপি কমিশনারের আদেশে মামুনুর রশিদের পাঁচ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর হলেও ওসি মনির হোসেন তাকে ছাড়েননি। ফলে যথাসময়ে স্ত্রীকে ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয়নি। যথাসময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় গত ১৬ জুন সকালের দিকে হঠাৎ কনস্টেবল মামুনের স্ত্রীর তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হয়। বাড়িতে কোনো পুরুষ লোক না থাকায় তড়িঘড়ি হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। গৃহস্থালি পরিবেশেই যমজ সন্তান প্রসব করেন তিনি। এতে মা ও নবজাতক যমজ সন্তানের (এক ছেলে ও এক মেয়ে) শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে।

 

সংবাদ পেয়ে কনস্টেবল মামুন অশ্রুসজল চোখে ছুটির জন্য ওসির দ্বারস্থ হলে ওসি মনির হোসেন উগ্র হয়ে বলেন, ‘এখন ছুটিতে যাওয়া যাবে না, আগে ভিভিআইপি ডিউটি, তারপর ছুটি। আমি ছুটি দেব না, আপনি যাকে খুশি গিয়ে বলেন- আমার কিছু যায় আসে না।’

 

নিরুপায় হয়ে মামুন বাইরে এসে কান্নাকাটি শুরু করেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সদর ও প্রশাসন) মাসুদ রানাকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। তিনি মানবিক বিবেচনায় ছুটির সুব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন এবং বিকল্প ডিউটি বণ্টন করে ওসির কাছে যেতে বলেন।

 

Manual4 Ad Code

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আশ্বাসের পর ছুটি নবায়নের আবেদন নিয়ে ফের ওসির কক্ষে গেলে মনির হোসেন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি কটূক্তি করে বলেন, ‘হাসপাতালে আজরাইল দাঁড়ায় আছে? আপনি গেলে আজরাইল চলে যাবে?’ ওসি মনির আরও বলেন, ‘আপনি আমার বিরুদ্ধে আইজিপি বা কমিশনার স্যারের কাছে বলতে পারেন, আমি ছুটি ছাড়ব না। আপনার চেহারা আমার থানায় দেখতে চাই না।’ এ সময় ওসি চেয়ার থেকে উঠে তাকে মারতে উদ্যত হন। যার অডিও রেকর্ড কালবেলার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

 

ওসির এ খামখেয়ালিপনা ও ইচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে সময়মতো বাড়ি পৌঁছাতে পারেননি কনস্টেবল মামুন। ১৬ জুন দুপুরের দিকে প্রথম সন্তান (কন্যা) সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। বাবার অনুপস্থিতিতেই ওইদিন সন্ধ্যায় শিশুটিকে দাফন করা হয়। বাবা হয়ে জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই নিজের কন্যাসন্তানের মুখটি দেখার সুযোগ পাননি তিনি। এরপর আশঙ্কাজনক অবস্থায় অন্য নবজাতককে (পুত্র) সিলেটের কুইন্স হাসপাতাল থেকে মা ও শিশু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ জুন রাত পৌনে ৪টায় দ্বিতীয় সন্তানটিও মারা যায়।

 

এ বিষয়ে জানতে কনস্টেবল মামুনুর রশিদদের ব্যবহৃত মুটোফোনে যোগাযোগ করা হলে জানান, ‘ছুটি না পাওয়ায় স্ত্রীকে চিকিৎসা করাতে পারিনি। আমার দুটি সন্তান মারা গেছে। একটি সন্তানেরও মুখও দেখতে পারেনি। আমার আর কিছু বলার নেই। আমি কমিশনার স্যারের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। স্যারের কাছে আমি সঠিক বিচার চাই।’

Manual3 Ad Code

 

যোগাযোগ করা হলে অভিযোগের বিষয়ে ওসি মনির হোসেন বলেন, ‘তার স্ত্রীর ৬ মাসের প্রিম্যাচিউড বাচ্চা হয়েছে। ৬ মাসে বাচ্চা হলে কি কোনো বাচ্চা বেঁচে থাকবে?’

 

স্ত্রীর চিকিৎসা করানোর জন্য আপনি তাকে ছুটি দেননি, চিকিৎসা না করাতে পারার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটছে- এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘আমি ছুটি দেওয়ার মালিক না।’

 

ছুটি নিয়ে গেলেও আপনি তাকে না ছেড়ে গালাগাল করেছেন, যার অডিও আছে- এমন মন্তব্যে ওসি বলেন, ‘অডিও থাকলে আমার কিছু বলার নেই। আমি তার স্ত্রী অসুস্থ শুনে এক ঘণ্টার মধ্যে ছুটি দিয়ে ছেড়েছি।’

Manual5 Ad Code

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code