নিহত বেড়ে ১৯, হঠাৎ স্পেনে অভিবাসীদের ঢল নামল কেন?

প্রকাশিত: ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২৬

নিহত বেড়ে ১৯, হঠাৎ স্পেনে অভিবাসীদের ঢল নামল কেন?

Manual1 Ad Code

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল সেউতায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছেন বলে অনুমান করছে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মরক্কো থেকে সমুদ্র ও স্থলপথে একযোগে সেউতায় প্রবেশের এই চেষ্টায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র।

 

শুক্রবার স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ছিটমহলটিতে অন্তত ৪৯ হাজার অনিয়মিত অভিবাসী প্রবেশ করেছে। তবে স্প্যানিশ পুলিশের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি দাবি করেছে, এ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।

Manual2 Ad Code

 

Manual3 Ad Code

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবারই স্পেন অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করেছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কাকে সঙ্গে নিয়ে সেউতা সফরে গেছেন। সেখানে তিনি সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

 

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, সর্বশেষ ঢলের আগে থেকেই গত কয়েক দিনে দেড় হাজারের বেশি অভিবাসী সেউতায় পৌঁছেছিলেন। নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো চরম চাপে পড়েছে এবং পরিস্থিতি এখন ‘অত্যন্ত গুরুতর’।

 

হঠাৎ অভিবাসীদের ঢল নামার কারণ কী?
হঠাৎ করে অভিবাসীদের এই নজিরবিহীন ঢল নামার পেছনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক যুগান্তকারী রায় এবং দেশটির নতুন উদার অভিবাসন নীতিকে দায়ী করছে সেউতার স্থানীয় প্রশাসন।

 

চলতি জুলাই মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। এই রায় অনুযায়ী, সমুদ্রপথে সেউতা অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টাকালে কোনো অভিবাসীকে আটক করা হলে, তাকে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।

Manual2 Ad Code

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের মতে, এই আইনি সুরক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্রগুলো হাজার হাজার অভিবাসীকে স্পেনে ঢুকতে উৎসাহিত করেছে। তারা অভিবাসীদের বুঝিয়েছে যে, এখন একবার স্পেনের জলসীমায় বা মাটিতে পা রাখতে পারলে আর সহজে ফেরত পাঠানো হবে না এবং পরবর্তীতে বৈধ হওয়ার সুযোগও মিলবে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে এর প্রমাণ মিলেছে। বেশকয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে মরক্কোর সীমান্তবর্তী শহর ফনিদেকে হাজারো তরুণ জড়ো হন। তাদের অনেকেই দাবি করেন, তারা শুনেছেন ‘সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে’।

 

সেউতার স্থানীয় সরকারের মুখপাত্র আলেহান্দ্রো রামিরেস বলেন, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় সেউতায় এই অভিবাসী ঢল নামার পেছনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই অনিয়মিত প্রবেশের চেষ্টা কমাতে বিদ্যমান আইনি বিধান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

Manual2 Ad Code

 

অন্যদিকে, চলতি ২০২৬ সালের শুরুতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের সরকার ঘোষণা করে যে, দেশটিতে অনিয়মিতভাবে থাকা ৫ লাখেরও বেশি অবৈধ অভিবাসীকে ধাপে ধাপে আইনি বৈধতা দেওয়া হবে। এই সহজ সাধারণ ক্ষমার খবর ছড়িয়ে পড়ায় উন্নত জীবনের আশায় আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা যেকোনো উপায়ে স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

 

স্প্যানিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত আগেই ইউরোপের অনান্য দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছিল। গতকাল অভিবাসীদের ঢল দেখে এবার তুলে স্পেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসামুক্ত ‘শেনজেন অঞ্চল’ থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।

 

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘সেউতা থেকে আসা দৃশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে স্পেনের বিরুদ্ধে শেনজেন চুক্তি স্থগিতের মতো ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’

 

মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকার মরক্কো উপকূল থেকে স্পেনের সেউতা শহরের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার (৩.১ মাইল)। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে সাঁতার কেটে বা ফোলানো টিউব ব্যবহার করে সাগরের বাঁধ পেরিয়ে চলে আসায় স্থানীয় সীমান্তরক্ষীদের পক্ষে এই স্রোত আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আরও জনিয়েছে, সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বেশিরভাগই মরোক্কান নাগরিক। এছাড়া ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মরক্কোয় অবস্থান করা কিছু আলজেরীয় নাগরিকও এই পথে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।

 

বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসীর সংখ্যায় এ আকস্মিক বৃদ্ধি ২০২১ সালের সীমান্ত সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময় মরক্কোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার সুযোগে মাত্র দুই দিনে ১০ হাজারের বেশি মরক্কো ও সাব-সাহারান আফ্রিকান তরুণ সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। পরে ২০২২ সালে মাদ্রিদ ও রাবাতের কূটনৈতিক আলোচেনার পর অনেককে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়।

 

প্রসঙ্গত, সেউতা ও মেলিয়া উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর এবং এগুলোই আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত। ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় অভিবাসীরা প্রায়ই এই দুই সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সূত্র: রয়টার্স, ইনফোমাইগ্রেন্ট

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code