জকিগঞ্জে দাম্পত্য কলহে দুর্বিষহ জীবন: কে দেখবে পাঁচ সন্তানের দিকে?

প্রকাশিত: ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৫

জকিগঞ্জে দাম্পত্য কলহে দুর্বিষহ জীবন: কে দেখবে পাঁচ সন্তানের দিকে?

Manual2 Ad Code

জকিগঞ্জ প্রতিনিধি :
সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের খাদিমান গ্রামের কয়েছ উদ্দিন ও জাসমীন বেগম দম্পতির দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ বর্তমানে স্থানীয়ভাবে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। এই বিরোধ একাধিক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং মামলা-মোকদ্দমার মধ্যদিয়ে সামাজিক, প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতায় পরিণত হয়েছে।

 

কয়েছ উদ্দিনের পরিবারের ভাষ্যমতে, ২০০৮ সালের ১৩ আগস্ট পারিবারিকভাবে এই দম্পতির বিয়ে হয়। তাদের সংসারে পাঁচ কন্যা সন্তান রয়েছে। ২০২০ সালে জীবিকার তাগিদে কয়েছ সৌদি আরবে যান এবং সাড়ে চার বছর পর দেশে ফেরেন।

জকিগঞ্জে দাম্পত্য কলহে দুর্বিষহ জীবন: কে দেখবে পাঁচ সন্তানের দিকে?

কয়েছ উদ্দিন।


কয়েছ উদ্দিন দাবি করেন, প্রবাসে থাকা অবস্থায় উপার্জিত সকল টাকা স্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কয়েছ অভিযোগ করেন, তার স্ত্রী বিদেশে থাকার সময় একটি অজানা ছেলে সন্তান এনেছেন, যার পরিচয় আজও অজানা। তিনি আরও বলেন, স্ত্রী চরিত্রহীন এবং দীর্ঘদিন ধরেই আমাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করছে।

Manual1 Ad Code

 

Manual6 Ad Code

কয়েছ উদ্দিনের বড় ভাই আহমদ ছাইফুর রহমান বলেন, আমার ভাই কয়েছ তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পরও সে এখনো তার ঘরে বসবাস করছে। স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও সে তা মানছে না।

 

স্থানীয় ইউপি সদস্য সাহেল আহমদ কুকন অভিযোগের বিরুদ্ধে বলেন, কয়েছ উদ্দিনকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, যা একেবারেই অনৈতিক।

 

তারা অভিযোগ করেন, যেকোনো বিচার চাওয়ার চেষ্টা করলে ওই নারী মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। দীর্ঘদিন ধরে কয়েছ তার নিজের বাড়িতে থাকতে পারছেন না। চলতি বছরের গত ২০ অক্টোবর (সোমবার) রাতে ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ জয়নাল আহমদকে জাসমীন বেগমের ঘরে সাড়ে ১১টায় দেখা গেছে, যা জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

Manual5 Ad Code

 

জাসমীন বেগম বলেন, দীর্ঘদিন অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে সংসার চালাচ্ছিলাম। একপর্যায়ে আমার পিত্রালয় থেকে জায়গা বিক্রি করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। পরে তিনি অনৈতিক পথে দেশে ফেরেন এবং আবার প্রবাসে যাওয়ার জন্য পিত্রালয় থেকে টাকা আনার চাপ দেন। এতে আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। এই সুযোগে আমার বাসুর আহমদ সাইফুর রহমান ও তার স্ত্রীর বাড়িতে যাওয়া আসা শুরু হয়। একপর্যায়ে তার বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিষয়টি নিয়ে মসজিদে ও মহল্লাবাসীর কাছে বিচার চেয়েও কোনো সুরাহা পাইনি।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিচারের নামে প্রতিবেশী আব্দুর রহমান, আহমদ সাইফুর রহমান, মেম্বার সাহেল আহমদ কুকন ও তার ভাই সুয়েব আহমদ আমার বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করত। একপর্যায়ে বাসুর আহমদ সাইফুর রহমান তার স্ত্রীর অসুস্থতার কথা বলে আমাকে তার বাড়িতে যেতে বললে, সুয়েব আহমদ ও আব্দুর রহমান জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে আমাকে ধর্ষণ করে। এই ঘটনায় আমি সিলেট নারী ও শিশু আদালতে মামলা দায়ের করেছি।

 

জাসমীন বেগম আরও বলেন, আব্দুর রহমান ও আমার স্বামীর বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতি ও মাদক মামলা রয়েছে। স্বামী জেলা হাজতে বন্দি থাকাকালে ছয় সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। বর্তমানে আব্দুর রহমানের সঙ্গে তার চলাফেরায় আমি বাধা দেওয়ায় একটি অপরাধচক্র আমাদের পরিবারকে ভয়াবহ সংকটে ফেলেছে। তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও প্রতিশোধপরায়ণ আচরণে আজ আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

 

Manual7 Ad Code

গ্রাম পুলিশ জয়নাল আহমদ বলেন, রাতে ইউনিয়ন পরিষদে পাহারার দায়িত্ব পালন করছিলাম। হঠাৎ আমাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে অনেক লোক দেখলাম। পরদিন শুনি আমাকে কয়েছ উদ্দিনের বাড়ি থেকে নেওয়া হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছে। আমার উপর এমন মিথ্যা অভিযোগে আমি গভীর শোকাহত।

 

কয়েছ উদ্দিন ও জাসমীন বেগমের বড় মেয়ে তাফসিয়া আক্তার বলেন, গত দিন আমাদের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে। আমার চাচা আহমদ সাইফুর রহমান, আব্দুর রহমান ও কুকন মেম্বার যেকোনো সময় আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। আমাদের বাবা-চাচার কাছে আমরা নিরাপদ নই।

 

সন্তানরা জানান, বাবার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মায়ের ওপর মামলা, হামলা, মানহানিকর কর্মকাণ্ড ও মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আমরা পাঁচ বোনের ভবিষ্যত নিয়ে আইনের সাহায্য ও নিরাপত্তা চাই।

 

সুলতানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি মিমাংসার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। গ্রাম পুলিশ জয়নাল আহমদ সংক্রান্ত বিষয় এখনও বিস্তারিত আমার জানা নেই।

 

জকিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ জহিরুল ইসলাম মুন্না জানান, জাসমীন বেগম থানায় অভিযোগ করেছেন। যেহেতু এটি পারিবারিক বিরোধ এবং আদালতে মামলা চলছে, তাই তাকে আদালতের মাধ্যমে মামলা পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং মামলার তদন্ত চলছে।

 

একটি পারিবারিক বিরোধ কীভাবে সামাজিক, প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতায় রূপ নিতে পারে, জকিগঞ্জের এই ঘটনা তার একটি বাস্তব উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপেই কেবল এই পরিবারটি একটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, এমনটাই আশা প্রকাশ করেন এলাকার বাসিন্দারা।

 

(সুরমামেইল/এএইচএল)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code