‘আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই’

প্রকাশিত: ৬:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২৬

‘আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই’

Manual1 Ad Code

নিকোলাস বিশ্বাস:
২৫ জুলাই ২০২৬ বিশ্ব ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’। এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাম্প্রতিক সিসিটিভি ভিডিও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ছোট শিশু একটি পুকুরে ডুবন্ত অবস্থায় বাঁচার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে। অপরদিকে, আরেকটি শিশু ঐ পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো চিৎকার করছে এবং মরিয়া হয়ে পানিতে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আশে-পাশে বাড়িঘর থাকলেও কেউ সেই আর্তনাদ শুনতে পায়নি। অবশেষে পাশের একটি বাড়ি থেকে একজন ব্যক্তি বেরিয়ে এসে উদ্ধার করতে এগিয়ে যান। কিন্তু শিশুটির শেষ পরিণতি কি হয়েছিল, তা ভিডিওটিতে আর জানা যায়নি।

 

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়, অথচ অধিকাংশ ঘটনাই সংবাদ শিরোনামে আসে না। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবারের বেদনা। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হওয়া সত্ত্বেও পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ এখনো সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা জনস্বাস্থ্য আলোচনায় প্রাধান্য পেলেও পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ রয়ে যায় আড়ালে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 

Manual3 Ad Code

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) জরিপ অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। এসব মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার বরিশাল অঞ্চলে। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, জলাভূমি এবং মৌসুমি বন্যাপ্রবণ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। বিশ্বব্যাপী পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে এই ঝূঁকি আরো বেড়েছে।

Manual6 Ad Code

 

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিষয়

এই দিবস উপলক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য বিষয় বেছে নেওয়া হয়। এবারের বিষয় হল: “Unite to Turn the Tide” – অর্থাৎ, আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই।  এটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য নয়; বরং পানির সঙ্গে আমাদের সহাবস্থানকে আরও নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলার একটি বৈশ্বিক আহ্বান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বব্যাপী এ প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করে আসুন আমরা প্রতিরোধযোগ্য ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু¢র মিছিল বন্ধ করি এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় ভূমিকার পালন করি।

 

বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল, হাওর ও পুকুরে সমৃদ্ধ একটি জলভূমির দেশ। পানি আমাদের জীবন, জীবিকা, কৃষি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অভাবে এই জীবনদায়ী পানিই মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় শোক ও বেদনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

 

প্রতিদিনের নীরব ঝুঁকি

জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ ঘটনা ঘটে বাড়ির কয়েক মিটারের মধ্যেই থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে। অর্থাৎ বিপদ দূরে নয়, পরিবারের কাছেই ওত পেতে থাকে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এ সময় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ির আঙিনা, রাস্তা ও মাঠ সাময়িক জলাশয়ে পরিণত হয়। অল্প সময়ের জন্যও কোনো ছোট শিশু নজরদারির বাইরে চলে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপূরণীয় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ সময়টায় সবাইকে বিশেষভাবে সর্তক থাকতে হয়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় অভিভাবকরা সাধারণতঃ গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে ছোট শিশুরা অরক্ষিত থেকে যায়। মাত্র দুই বা তিন মিনিটের অসতর্কতা একটি পরিবারের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে যা তাদের জন্য নিয়ে আসতে পারে গভীর শোক আর কান্না।

 

Manual6 Ad Code

পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো এর নীরবতা। সিনেমায় যেমন দেখা যায়, বাস্তবে পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষ – বিশেষ করে শিশুরা – সাধারণতঃ হাত নেড়ে বা চিৎকার করে সাহায্য চাইতে পারে না। আশে-পাশের মানুষের অজান্তেই তারা নীরবে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢কে “নীরব কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট” হিসেবে অভিহিত করেছে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

 

২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ জুলাইকে সারা বিশ্ব ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস¢ হিসেবে ঘোষণা করে। এ ব্যাপারে বিশ্ব ষ্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ক্রমেই বাড়ছে। তাই পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ প্রতিরোধকে কেবল মৌসুমি উদ্যোগ নয়, জাতীয় জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারে পরিণত করা উচিৎ।

 

কেন এই মৃত্যু থামছে না?

বাংলাদেশে অধিকাংশ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ পরিস্থিতিতে। বাড়ির পাশের পুকুর, রাস্তার ধারের ডোবা কিংবা বৃষ্টির পানিতে ভরা গর্ত মুহূর্তেই প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী ও চলাফেরায় সক্রিয় হলেও তারা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারে না। এ সময় রান্না, কাপড় ধোয়া বা অন্য কোনো কাজে সামান্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে অভিভাবকের অজান্তেই শিশুটি ঝুঁকির মুখে পড়ে যা পরিবার ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে।

 

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের বৃহত্তম নদীবাহিত দেশগুলোর একটি হওয়ায় এখানে হাজার হাজার নদী, খাল, বিল ও জলাশয় রয়েছে। বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘনঘন বন্যা চারপাশে নতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় সৃষ্টি করে ও বিপদ ডেকে আনে। চলতি বছরের প্রবল বৃষ্টিপাত এ বিপদকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

 

প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সহজ ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর উপর দৃষ্টিপাত করা অতীব জরুরি:-

 

১. ছোট শিশুদের কখনোই পানির কাছাকাছি একা না রাখা।

২. বাড়ির আশপাশের পুকুর ও ডোবার চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বেড়া নির্মাণ করা।

৩. দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন করা।

৪. বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা।

৫. জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধারকৌশল ও কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR)-এর প্রশিক্ষণ দেওয়া।

Manual8 Ad Code

 

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, এসব উদ্যোগ কার্যকর। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB) -এর উদ্যোগে পরিচালিত আঁচল (কমিউনিটি শিশুযত্ন মডেল) এবং সুইমসেইফ (SwimSafe) কর্মসূচি শিশুদের পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সফল হয়েছে। সমাধান আমাদের জানা আছে; এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দেশব্যাপী কার্যকর বাস্তবায়ন। গবেষণালব্ধ ফলাফল গুরুত্বের সাথে কাজে লাগানো উচিৎ।

 

পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা- এই চারটি সরকারি খাতের সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্খিত ফল আসবে না।

 

সচেতনতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ

বিশ্ব ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস¢ যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; এটি হতে হবে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশকে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ, গণসচেতনতামূলক প্রচার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ – একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা জাতীয় নেতা – যার স্বপ্ন অকালেই নিভে যায়।

 

পানিতে ডুবে কোনো শিশুর মৃত্যু কখনোই কাম্য হতে না। সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ, নিরাপত্তা শিক্ষা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারে এবং এই নীরব সংকট তথা পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে। প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য, কোনো অবস্থাতেই সেই জীবনের মূল্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

 

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস- একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং ‘জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল’ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code