গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ

প্রকাশিত: ২:৪১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২৬

গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ

Manual3 Ad Code

গ্যাসের ‘শূন্য সরবরাহ’, হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ। ছবি: সংগৃহীত


মেইল ডেস্ক:
হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে চাহিদার তুলনায় অল্প গ্যাস সরবরাহ পেলেও বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কারখানার চাকা থেমে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

 

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

 

যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন বলেন, তাদের শিল্পপার্কে ছয়টি কারখানা রয়েছে। টায়ার ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়া বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানই শতভাগ রপ্তানিমুখী।

 

তিনি জানান, শিল্পপার্কে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন। কারখানাগুলোর দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ বেশ কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এতে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

 

স্টার সিরামিক্সের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছুদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার দুপুর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

 

তিনি জানান, প্রতিদিন ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন হতো। এখন পুরো উৎপাদন বন্ধ। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার ক্ষতি হচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা।

 

হবিগঞ্জের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। এখন পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও বন্ধ রয়েছে।

 

তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মস্থলে এসে অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তাদের আয়-রোজগার ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি।

Manual4 Ad Code

 

একই প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মচারী শেফালী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন।

 

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাই। কারখানা বন্ধ থাকলে আমাদের কাজ নেই, আয়ও নেই। কত দিন এভাবে চলবে, সেটাও জানি না। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের মতো শ্রমিকদের পরিবার সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে।’

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জের সব শিল্পকারখানায় একইভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। কিছু কিছু কোম্পানিতে এখনো গ্যাস সরবরাহ রয়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্যাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু কোম্পানিতে এখনো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। তাহলে একই এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ভিন্নতা কেন? আমরা এটাকে বৈষম্য হিসেবে দেখছি।’

 

তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকট যদি জাতীয় সমস্যা হয়, তাহলে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা উচিত। কোন প্রতিষ্ঠান গ্যাস পাবে আর কোনটি পাবে না, এ ধরনের বৈষম্য শিল্পখাতে সংকট আরও বাড়াবে।

 

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন।

 

তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট চললেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সরবরাহ একেবারে শূন্য হয়ে গেছে। ফলে শিল্পপার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

 

স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু বুধবার বিকেল ৩টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। এতে কারখানার প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

 

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘বায়ারদের অর্ডার নেওয়া আছে, কিন্তু এখন উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একসময় বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন,’ বলেন তিনি।

 

Manual8 Ad Code

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানিমুখী।

 

এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। গ্যাস না থাকায় ক্যাপটিভ পাওয়ারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও উৎপাদন, দুই দিক থেকেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিল্পকারখানাগুলো।

Manual3 Ad Code

 

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই গ্যাস সংকট শুরু হয়। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কমানো বা বন্ধের বিষয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে। তবে কেন সরবরাহ কমানো বা বন্ধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে চিঠিগুলোতে স্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর।

 

Manual5 Ad Code

জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সংকট শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।’

 

তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমাতে হয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

 

শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক ক্রেতাদের আস্থা, সবকিছুই ঝুঁকিতে পড়ছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের।

 

শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি শিল্প উদ্যোক্তারাও দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও সমান নীতি অনুসরণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

(সুরমামেইল/এমএকে)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code