সিলেট ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:৪২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২৬
মেইল ডেস্ক:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণে আনা বিলের বিরোধিতা করতে গিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ এনে তিনি বলেছেন, ‘বিসিবি এখন আর ক্রিকেট বোর্ড নেই, সেটি বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়েছে।’
বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনের বিকালের অংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল, ২০২৬’ উত্থাপনের অনুমতি চান।
এ সময় বিল উত্থাপনে আপত্তি জানান এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে কণ্ঠভোটে তার আপত্তি নাকচ হয়। পরে বিলটি সংসদে উত্থাপিত হলে তা সংসদ সদস্যদের সায় পায়।
বিল উত্থাপনের সময় আপত্তি জানিয়ে হাসনাত বলেন, প্রস্তাবিত আইনে ‘কমিশন’ বলতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বোঝানো হয়েছে। আবার ২-এর ‘ঘ’ উপধারার সংজ্ঞায় ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে ‘সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে’ সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে একভাবে দেখা হবে, আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কার্যাবলিকে অন্যভাবে দেখা হবে।
হাসনাতের প্রশ্ন, ‘সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে’ সংঘটিত হত্যাকাণ্ড কোনটি, সেটি কে নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, এই আইন অনুযায়ী সেটি সংজ্ঞায়িত করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। অর্থাৎ, এই ইনডেমনিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর নির্ভর করবে।
এ সময় তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বিদ্যমান কাঠামো যদি ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী চলে, তাহলে সেটি ‘পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত’ একটি কমিশন হয়ে থাকবে।
তার অভিযোগ, এই কমিশন অতীতে ‘বিরোধী দল ও মত দমন এবং ভিক্টিম ব্লেমিং’-এর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি ‘গুম-খুনের বৈধতা উৎপাদন’ করার অভিযোগও তিনি তোলেন।
হাসনাত বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয় এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কার্যক্রমের বিচার ও নিরীক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক, বিচার বিভাগ ও ক্রিকেট বোর্ডের প্রসঙ্গ টানেন।
তার ভাষায়, বাংলাদেশ ব্যাংক দখল করা হয়েছে। বিসিবি এখন আর ক্রিকেট বোর্ড নেই, সেটি বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়েছে।…আমি যখন এখানে কথা বলছি, ঠিক এই মুহূর্তে ২৮ জন বিচারককে শপথ দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে গত ফেব্রুয়ারির শেষে মো. মোস্তাকুর রহমানকে সেই দায়িত্ব দেয় তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তার কোম্পানি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ গত ডিসেম্বরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময় পুনঃতফশিল করা হয়।
এসব কারণে তাকে গভর্নর করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আসছে সংসদের বিরোধী দল এনসিপি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন অ্যাডহক কমিটি করে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের ওই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু, প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী রাশনা ইমাম, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান সিনহার ভাতিজা ফাহিম সিনহা।
এছাড়া আছেন প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী, ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান সালমান ইস্পাহানি, ইন্দিরা রোড ক্রীড়াচক্রের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বাবু, ক্রিকেট বলের সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু এবং সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আতহার আলি খান।
এমন বাস্তবতায় গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের ঘটনাগুলোতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে কতটা নিরপেক্ষ অনুসন্ধান পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এনসিপির এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, বিলটি কার্যকর করতে হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘অবশ্যই স্বায়ত্তশাসিত’ করতে হবে।
বিএনপির দিকে ইংগিত করে তিনি বলেন, ‘যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক নিপীড়ন’ হয়েছে, তাদের কাছ থেকে তিনি একটি স্বতন্ত্র মানবাধিকার কমিশনের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেটিকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
হাসনাত বলেন, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মত প্রতিষ্ঠানগুলো তাত্ত্বিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ‘দলীয়করণ’ করা হচ্ছে, তাতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ভবিষ্যতে ‘বিরোধী দল দমন কমিশন’ হবে না, সে বিষয়ে তাদের আস্থা নেই।
এ কারণেই বিলটি পাসের আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি বলে মত দেন তিনি।
হাসনাতের ভাষায়, তা না হলে বিসিবির মতো আমরা আবার ‘বাপের দোয়া’ কমিশন বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মত দলীয়করণ দেখতে পাব।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিলটির উদ্দেশ্য হল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া।
তার ভাষায়, এটি ‘জুলাই যোদ্ধাদের দাবি’ ছিল এবং পরে তা ‘জাতীয় দাবিতে’ পরিণত হয়। জাতীয় জুলাই সনদেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার ছিল।
মন্ত্রী বলেন, “জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের ওপর আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা নিপীড়ন, অত্যাচার ও গণহত্যা চালিয়েছিল। জনতার প্রতিরোধেও কেউ কেউ প্রাণ হারিয়েছে।
“এটা যুদ্ধের ময়দানে ফায়সালা হয়ে গেছে। সে কারণেই তাদের সুরক্ষায় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।”
বিলের এই পর্যায়ে আপত্তি না তুলে সংশোধনী আনতে চাইলে আগে নোটিস দেওয়ার সুযোগ ছিল বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিল উত্থাপনের পরও অন্য বিধিতে বিষয়টি তোলা যেতে পারে।
বিসিবি প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের জবাবে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এই বিলের আলোচনায় ক্রিকেট বোর্ডের প্রসঙ্গ আসার ‘যৌক্তিকতা নেই’।
তার ভাষায়, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা ক্ষমতার প্রয়োগ করে জেলা কমিটি ও নিবন্ধিত ক্লাবগুলোর কাউন্সিলরদের প্রভাবিত করে একতরফাভাবে বোর্ড গঠন করেছিলেন।
“ওই প্রক্রিয়া নিয়ে হাই কোর্টে রিট নিষ্পত্তির আগেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। পরে বর্তমান সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং তাদের প্রতিবেদনে অনিয়মের কথা উঠে আসে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আগের বোর্ড বিলুপ্ত করে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিধি অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দেবে।”
হাসনাতের ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রী বলেন, “আমরা এখানে বাপের দোয়া-মায়ের দোয়া করিনি। এতদিন শুনতাম মায়ের দোয়া পরিবহন আছে। আজকে মাননীয় সংসদ সদস্যের কল্যাণে দেখলাম ‘বাপের দোয়া’ কমিটি আছে।”
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও আইসিটি আইনের মধ্যে কিছু বিষয়গত ওভারল্যাপ আছে। আইনমন্ত্রীও এ বিষয়ে আগে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করা, যার সঙ্গে গুমবিষয়ক আইন ও আইসিটি আইনের সামঞ্জস্য থাকবে।”
তিনি বলেন, গুমের অভিযোগে এখন আইসিটি আইনে বিচার চলছে; সেখানে তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন টিম ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের ব্যবস্থা আছে।
এর বাইরে কম ক্ষমতা দিয়ে মানবাধিকার কমিশনকে অস্থায়ী তদন্তের দায়িত্ব দিলে ‘এক-দেড় বছর সময় বিনষ্ট’ হতে পারে বলে তার ভাষ্য।
সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া আগের অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আইন করেছে।
পার্বত্য সমস্যা, এলজিবিটি প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ‘আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, দেশোপযোগী’ একটি মানবাধিকার কমিশন গঠনের জন্য সংসদে বিল আনার কথা তিনি বলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হাসনাতের সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক কারা এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তা ‘দেশের মানুষ’ জানে।
“বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একই ধরনের সমালোচনা থাকলেও সরকার সে বিতর্কে যেতে চায় না।”
(সুরমামেইল/এমকে)
প্রধান উপদেষ্টাঃ ফয়েজ আহমদ দৌলত
উপদেষ্টাঃ খালেদুল ইসলাম কোহিনূর
উপদেষ্টাঃ মোঃ মিটু মিয়া
উপদেষ্টাঃ অর্জুন ঘোষ
আইন বিষয়ক উপদেষ্টাঃ এড. মোঃ রফিক আহমদ
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মোহাম্মদ হানিফ
সম্পাদক ও প্রকাশক : বীথি রানী কর
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ফয়সাল আহমদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: কামরুল হাসান
নিউজ ইনচার্জ : সুনির্মল সেন
অফিস : রংমহল টাওয়ার (৪র্থ তলা),
বন্দর বাজার, সিলেট।
মোবাইল : ০১৭১৬-৯৭০৬৯৮
E-mail: surmamail1@gmail.com
Copyright-2015
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি