যৌন হয়রানি, আজীবন চাকরিহীন হতে যাচ্ছেন কোচ

প্রকাশিত: ৪:০৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯

যৌন হয়রানি, আজীবন চাকরিহীন হতে যাচ্ছেন কোচ

Manual3 Ad Code

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাঁতারু কোচ সুরজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছিলেন জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া এক কিশোরী  ও তার পরিবার। কোচের ডাকে সাড়া দিয়ে তাই চলতি বছরের মার্চে সপরিবার গোয়া চলে গিয়েছিলেন তাঁরা। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই যৌন হেনস্থার শুরু। দীর্ঘ ছ’মাস নানা অছিলায় সুরজিৎ জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ওই কিশোরী সাঁতারুর যৌন হেনস্থা করতেন বলে অভিযোগ। লজ্জায়, অপমানে, ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখত মেয়েটি। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় এক দিন নিজেই ঠিক করে ফেলে, সব ফাঁস করে দেবে। সেই মতোই কোচের দুষ্কর্মের ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে সে।

কিশোরীর ভাষ্য, ‘‘গোয়া যাওয়ার পর থেকেই স্যর আমার সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করতেন। ব্ল্যাকমেল করতেন। আমি আর মানসিক ভাবে নিতে পারছিলাম না। তখনই ঠিক করি, কিছু একটা করতে হবে। সেই মতো মোবাইলে ওই ভিডিও রেকর্ড করি।’’

জাতীয় প্রতিযোগিতা থেকে পদক জেতা বাংলার ওই কিশোরী সাঁতারু গোয়া থেকে পালিয়ে আসার কাহিনিও এ দিন শোনান আনন্দবাজারকে। তার কথায়, ‘‘স্যর তখন গোয়ায় ছিলেন না। সিনিয়র ন্যাশনাল মিটের জন্য ভোপালে গিয়েছিলেন। সেই সময়েই আমরা পালিয়ে আসি রিষড়ার বাড়িতে। স্যর ওখানে থাকলে আমরা হয়তো ফিরতেই পারতাম না। আরও বড় ক্ষতি হয়ে যেত আমার।’’

Manual7 Ad Code

‘পাঁচ বছর ধরে স্যরের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। খুবই ভাল ছিল। স্যরের ছেলেও খুব ভাল সাঁতারু।’’ একটু থেমে, ‘‘কোনও দিন ভাবিনি, স্যর আমার সঙ্গে এ রকম…!’’ কথা আর শেষ করতে পারে না বছর পনেরোর কিশোরী। ফোনটা সাইলেন্ট হয়ে যায়।

এদিকে যৌন হেনস্থার ওই ঘটনা নিয়ে সকালে টুইট করে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজু। অভিযুক্ত সাঁতার কোচের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। কোচ যেন কোথাও চাকরি না পান সে ব্যবস্থাও করবেন তিনি। কিরেন রিজিজুর নির্দেশে তার সচিব আজ রিষড়ার ওই কিশোরীকে আজ ফোনও করেছেন।

Manual1 Ad Code

বৃহস্পতিবার একাধিক কড়া টুইট করে রিজিজু জানিয়েছেন, অভিযুক্ত বাংলার কোচ যেন কোথাও চাকরি না পান। টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি কড়া পদক্ষেপ করেছি। গোয়া সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন ওই কোচ সুরজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে। সুইমিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছি, সুরজিৎ যেন দেশের কোথাও চাকরি না পায়। সমস্ত ফেডারেশন এবং সর্ব ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য।’

Manual8 Ad Code

এখানেই থেমে থাকেননি রিজিজু। আর এক টুইট করে তিনি লিখেছেন, ‘স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে ওর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রথমত, এটা ঘৃণ্য অপরাধ। তাই কোচের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে আমি দাবি করেছি।’

কিশোরী সাঁতারুর এই বিস্ফোরক অভিযোগের পরে সুরজিৎকে নিয়ে এখন কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে অতীতেও নাকি তিনি এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন! কিন্তু, কোচের কুকীর্তি নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চাননি। নিজেদের কেরিয়ার নষ্ট হওয়ার কথা ভেবে।

কলকাতার সাঁতার মহল ভীষণই ক্ষুব্ধ, তা টের পাওয়া গেল প্রাক্তন সাঁতারু বুলা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার সময়। আমার তো সব শুনে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে।’’ কিরেন রিজিজুর সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেই মনে করছেন বুলা। তাঁর কথায়, ‘‘ক্রীড়ামন্ত্রী একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোথাও যেন চাকরি না পায় ওই লোকটা (সুরজিৎ)। তবে, মেয়েটার মানসিক অবস্থা আমি উপলব্ধি করতে পারছি। আশা করব, যে সাঁতারের জন্য ওকে এত বড় মূল্য দিতে হয়েছে, সেই সাঁতার যেন ও না ছাড়ে। প্রচণ্ড মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছে। ওর সারা জীবন পড়ে রয়েছে। আগামী দিনেও এ রকম কঠিন মানসকিতারই যেন পরিচয় দেয় মেয়েটা।’’

Manual4 Ad Code

একই কথা বলছেন অলিম্পিয়ান দীপা কর্মকারের কোচ বিশেশ্বর নন্দী। এ দিন আগরতলা থেকে তিনি বলেন, ‘‘ঘটনটি যদি ১০০ শতাংশ সত্যি হয়, তা হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যা সাজা হওয়া দরকার তাই যেন হয় ওই কোচের।’’

কোচের এই ‘কীর্তি’র কথা জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ টেবল টেনিস খেলোয়াড় পৌলমী ঘটক। তিনি এ দিন বলেন, ‘‘বাবার পরেই আমরা কোচকে রাখি। একটা-দুটো ঘটনার প্রেক্ষিতে সবাইকে এক ভাবে বিচার করা ঠিক হবে না। মেয়েটা যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তাতে আমি গর্ব বোধ করছি। ও আরও অনেক মেয়েকে সাহস দিয়ে গেল।’’

মেয়েকে নিয়ে গর্বিত ওই কিশোরীর বাবাও। ভয়-আতঙ্ক-মেয়ের কেরিয়ার— সব কিছুকে সরিয়ে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘বাবা হিসেবে এই পোস্ট লিখতে আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। আমার মেয়ের সমবয়সী তো ওর (সুরজিতের) ছেলে রয়েছে। এই নোংরামি করার আগে কি একবারও ছেলের কথা ওর মনে পড়ল না?’’ এ দিনও তিনি রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন। সোমবার রাতে তারা প্রথম রিষড়া থানায় গিয়েছিলেন অভিযোগ দায়ের করতে। কিন্তু পুলিশ তাদের গোয়ায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করাতে পরামর্শ দেয়। এর পর মঙ্গলবার দুপুরে চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (শ্রীরামপুর) ঈশানী পালের সঙ্গে আনন্দবাজারের তরফে যোগাযোগ করা হয়। সমস্তটা শুনে তিনি অভিযোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু, কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ বুধবার রাতে দীর্ঘ ক্ষণ তাদের অপেক্ষা করিয়ে রেখেও অভিযোগ নেয়নি রিষড়া থানা। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই অভিযোগ দায়ের করতে পেরেছেন তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code