১৬ বছরে ১০ বার মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁস, আয় শত কোটি টাকা

প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২৩

১৬ বছরে ১০ বার মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁস, আয় শত কোটি টাকা

Manual6 Ad Code

সুরমামেইল ডেস্ক :
২০০১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে অন্তত ১০ বার মেডিক‌্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে সাতজন চিকিৎসক রয়েছেন বলেও জানায় সিআইডি।

 

রোববার (১৩ আগস্ট) দুপুরে মালিবাগে অবস্থিত সিআইডির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া।

গ্রেপ্তার সাত চিকিৎসক


সিআইডি জানায়, চক্রটি এখন পর্যন্ত ১০ বার প্রশ্ন ফাঁস করেছে। আর এতে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। গত ৩০ জুলাই থেকে ১০ দিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ৯টি মোবাইল ফোন, ৪টি ল্যাপটপ, নগদ ২ লাখ ১১ হাজার টাকা, ১৫ হাজার এক শত বিদেশি থাই বাথ, বিভিন্ন ব্যাংকের ১৫টি চেক বই, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, ভর্তির এডমিট কার্ড জব্দ করা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষা সামনে আসলেই এক শ্রেণির চক্র বেশ সক্রিয় হয়ে উঠে প্রশ্ন ফাঁস করার জন্য। এই চক্র নানা কায়দায় প্রশ্ন ফাঁস যেমন করে, তেমনি গুজব ছড়িয়ে পরিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিভ্রান্তও করে। শিক্ষা খাতের ক্যান্সার হিসেবে বিবেচিত এসব প্রশ্ন ফাঁস চক্রকে নির্মূল করতে কাজ করছে পুলিশ।

 

সিআইডি  প্রধান বলেন, দেশের মেডিক‌্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে নিয়মিত প্রশ্নফাঁসকারী বিশাল এক সিন্ডিকেটের খোঁজ পায় সিআইডির সাইবার পুলিশ। ২০২০ সালে মিরপুর মডেল থানায় করা এক মামলায় সম্প্রতি চক্রের অন্তত ৮০ জন সক্রিয় সদস্য বিগত প্রায় ১৬ বছরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে অবৈধ উপায়ে মেডিক‌্যাল কলেজগুলোতে ভর্তি করিয়ে শত কোটি টাকা আয় করেছে। প্রশ্ন ফাঁস করে মেডিক‌্যালে ভর্তি হয়েছেন এমন শতাধিক শিক্ষার্থীর নাম পেয়েছে সিআইডি। এরমধ্যে অনেকে পাস করে ডাক্তারও হয়েছেন।

Manual2 Ad Code

 

Manual1 Ad Code

গত ৩০ জুলাই থেকে ১০ দিন ঢাকাসহ টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল জেলায় অভিযান পরিচালনা করে এ চক্রটির ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরমধ্যে ৭ জনই ডাক্তার। তাদের সবাই বিভিন্ন মেডক‌্যাল ভর্তি কোচিং সেন্টার, নয়তো প্রাইভেট পড়ানোর আড়ালে প্রশ্ন ফাঁস করতেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে অন্তত ১০ বার এই চক্র মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁস করেছে।

 

গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের দেওয়া বিপুল সংখ্যক ব্যাংকের চেক এবং এডমিট কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। এদের ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথাও জানান তিনি।

 

সিআইডি  প্রধান বলেন, প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মাস্টারমাইন্ড জসীম উদ্দিন ভূইয়ার কাছ থেকে একটি গোপন ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। যেখানে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা তার চক্রের অন্যান্য সদস্যদের নাম রয়েছে।  ২০২০ সালের প্রশ্ন ফাঁস সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তে নেমে সিআইডি প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মূল হোতা জসীম উদ্দীন ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রেসের মেশিনম্যান জসিমের খালাতো ভাই মোহাম্মদ সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এই ১২ জনের নাম আসে। দীর্ঘ দিন তারা পলাতক ছিলেন। অবশেষে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

Manual5 Ad Code

তিনি বলেন, চক্রের সদস্যদের ব্যাংক একাউন্ট বিশ্লেষণ করে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এরা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে কোন অপরাধ করেছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। মেডিক‌্যালের প্রশ্ন ফাঁস চক্র  চিকিৎসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা স্বামী -স্ত্রী। স্বামী চিকিৎসক ময়েজ উদ্দিন আহমেদ  প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম হোতা । তিনি  ময়মনসিংহ মেডিক‌্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ফেইম নামক কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়ান। কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে মেডিক‌্যালের প্রশ্নপত্র ফাঁস করে  অবৈধভাবে শত শত শিক্ষার্থীকে মেডিক‌্যালে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন ফাঁস ও মানিলন্ডারিং দুই মামলাতেই এজাহারনামীয় আসামি। ময়েজ চিহ্নিত ছাত্র শিবির নেতা এবং পরবর্তীতে জামায়তের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত। তার স্ত্রী গ্রেপ্তার সোহেলী জামান (৪০) প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম সদস্য। তিনি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চক্ষু ডাক্তার। ময়মনসিংহ মেডিক‌্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ফেইম নামক কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে স্বামী ময়েজের মাধ্যমে মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়ান তিনি।

 

তিনি জানান, গ্রেপ্তার চিকিৎসক মো. আবু রায়হান ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ২০০৫ সালে প্রশ্ন পেয়ে ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হয়ে এই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। প্রাইমেট কোচিং সেন্টার চালাতেন। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে একটি বেসরকারি ডায়গনেস্টিক সেন্টারে ডাক্তারি প্রাকটিস করেন।

 

গ্রেপ্তার চিকিৎসক জেড এম সালেহীন শোভন (৪৮) মেডিক‌্যাল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম মূল হোতা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁস মামলার এজাহারনামীয় আসামি। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক‌্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে থ্রি-ডক্টরস নামক কোচিং সেনটারের মাধ্যমে মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত হন । প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে শোভন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি ২০১৫ সালে র‌্যাবের হাতে একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। শোভন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক‌্যাল কলেজের ছাত্রদলের পদধারী নেতা ছিলেন। গ্রেপ্তার চিকিৎসক মো. জোবাইদুর রহমান জনি মেডিকো ভর্তি কোচিং সেন্টারের মালিক। ২০০৫ সাল থেকে এই চক্রে জড়িত হন।  তিনি নামকরা বিভিন্ন ডাক্তারের সন্তানদের প্রশ্ন ফাঁস করে মেডিক‌্যালে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি মূল হোতা জসীমের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। এই ব্যবসা করে দামি গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংকে নগদ অর্থসহ কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত শত শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সরকারি-বেসকারি মেডিক‌্যাল কলেজে ভর্তি করান। আর জনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক‌্যাল কলেজের ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে যুবদলের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক। গ্রেপ্তার চিকিৎসক  জিলুর হাসান রনি  জাতীয় পঙ্গু হাসপাতাল (নিটোর) একজন ডাক্তার। ২০০৫ সাল থেকে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত হন। ২০১৫ সালের মেডিকেল পরীক্ষার সময় র‌্যাবের হাতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে রংপুর থেকে গ্রেপ্তার হন। রংপুর মেডিক‌্যালে অধ্যায়নকালে ছাত্রদল নেতা ছিল। বর্তমানে ড্যাব এর সঙ্গে জড়িত এবং আহত বিএনপি নেতাদের চিকিৎসায় গঠিত দলের একজন চিকিৎসক।

 

সিআইডি প্রধান জানান, গ্রেপ্তার চিকিৎসক ইমরুল কায়েস হিমেল (৩২) পিতা আব্দুল কুদ্দুস সরকারের মাধ্যমে এই চক্রের সথে জড়ান । বেসরকারি কমিউনিটি ব্যাজেড মেডিক‌্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ থেকে ডাক্তারি পাস করেন। ২০১৫ সালে টাঙ্গাইলের আকুর-টাকুর পাড়ায় নিজ শ্বশুর বাড়িতে মেডিক‌্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পড়িয়ে বিপুল সংখ্যাক শিক্ষার্থীকে  অবৈধভাবে  ভর্তি করান।

 

অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া জানান, সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মুক্তার মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের হোতা জসীম এর বড় ভাই ও স্বাস্থ্য-শিক্ষা ব্যুরো প্রেসের মেশিনম্যান সালামের এর খালাতো ভাই। তিনি নিজে আলাদা একটি চক্র চালাতেন।  প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত শত শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিক‌্যাল কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। গ্রেপ্তার রওশন আলী হিমু চক্রের হোতা জসীমের ঘনিষ্ট বন্ধু এবং পুরনো সহযোগী। রওশন আলী হিমু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তার আক্তারুজ্জামান তুষার  মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মাস্টারমাইন্ড জসীমের ঘনিষ্ট সহচর। মেডিক‌্যাল প্রশ্ন ফাঁস মামলার এজহারনামীয় আসামি। ই-হক নামে কোচিং সেন্টার চালাতেন। ২০০৫ সাল থেকে এই চক্রের সঙ্গে জড়ান। ২০১৫ সালে রাবের হাতে একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিল। এছাড়া, গ্রেপ্তার জহির উদ্দিন আহমেদ মেডিক‌্যাল প্রশ্নফাঁস চক্রের মাস্টারমাইন্ড জসিমের পুরানো সহচর। ঢাকার ফার্মগেটে ইউনিভার্সেল নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সহায়তা কেন্দ্র চালাতেন। ২০০৫ সাল থেকে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তিনি।

 

(সুরমামেইল/এফএ)

Manual6 Ad Code


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code