হাওরে ডুবে গেলো ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান, দিশাহারা কৃষকরা

প্রকাশিত: ৮:১৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০২৬

হাওরে ডুবে গেলো ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান, দিশাহারা কৃষকরা

Manual7 Ad Code

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির পাকা-আধা ধান। জমির ফসল ডুবে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। পানির চাপে দুই উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবে গেছে।



জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জে হাওরের ৪৪ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো আবাদের অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা এখনও বাকি। এরই মধ্যে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে। যার পরিমাণ ১০ হাজার হেক্টরের বেশি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও পাহাাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছোট-বড় ২০টি হাওর তলিয়ে গেছে। এসব হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ভারতীয় ঢলে এসব ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। এখনও তলিয়ে যাচ্ছে। হাওরের পানি ও নদীর পানি সমান্তরালে প্রবাহিত হওয়ায় নিষ্কাশনের কোনও সুযোগ নেই। গত দুদিন পানির মধ্যে ধান কাটলেও আজ কাটারও কোনও অবস্থা নেই।

 

কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে জামালগঞ্জের পাগনার হাওর, হালির হাওর, মধ্যনগরের চিন্নির হাওর, টগার হাওর, দেখার হাওর, কানলার হাওরের ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ডুবে গিয়েছিল। এতে অধিকাংশ ধান পচে যায়। তখন কিছু রক্ষা করা গেলেও এবার রক্ষার সুযোগও কম।

 

শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার কৃষকরা জানিয়েছেন, জমির ফসল ডুবে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। হাওরে পানির চাপ, বজ্রপাত আতঙ্কের মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকটসহ নানা কারণে সংকট গভীর তৈরি হয়েছে। সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের জমির ধান তলিয়ে গেছে। আবার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকের শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে।

Manual4 Ad Code

 

পানির চাপে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোও চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে। আজ সকালে জেলার মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেছে। দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। বাঁধ দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত নয়। স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেছিলেন। এছাড়া দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকেছিল। সকাল থেকে পাউবো কর্মকর্তারা ওই বাঁধে অবস্থান করছিলেন। বাঁধটির কাজ গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলে সেটি হয়নি।

 

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলার কৃষকরা।

শাল্লার হবিবপুরপুর গ্রামের কৃষক আনু মিয়া বলেন, ‘ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের কোনও ব্যবস্থা রাখা হয় না। তাই বৃষ্টির পানিতে আমাদের ক্ষেতের ধান তলিয়ে গেছে।’

 

Manual4 Ad Code

মধ্যনগর গ্রামের কৃষক ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘নদী খনন না করে বছরের পর বছর মাটির বাঁধ দেওয়ার ফলে হাওর ডুবে যায়। প্রতি বছর একই ভোগান্তির শিকার হচ্ছি আমরা। এবার আমাদের পাকা ধান ডুবে গেছে।’

 

Manual5 Ad Code

পাউবো বলছে, সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। আগামী দুই দিনও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। একইসঙ্গে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এতে উজানের পাহাড়ি ঢল নামবে। হাওরের জন্য আগামী দুই দিন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

 

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। জেলায় এ পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। সবমিলিয়ে হাওর ও নন হাওরে ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। হাওরে বোরো ধান কাটায় এখন কৃষকরা হারভেস্টর মেশিনের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। শিলাবৃষ্টিতে ৫৩৮ হেক্টর ও জলাবদ্ধতায় ১ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না নামলে আরও কিছু জমির ধান পচে নষ্ট হবে।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার জন্য। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে।’

 

কৃষকরা বলছেন, প্রতিকূল আবহওয়ার কারণে ধান শুকাতেও পারছেন না তারা। বজ্রাঘাতের কারণে হাওরে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট। অপরদিকে অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতে কোমর পর্যন্ত পানি জমে আছে। সুমেশ্বরী, যাদুকাটা, মনাই, খাসিয়ামারা, চেলা, পিয়াইনসহ সীমান্ত এলাকার নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ অনেক বেড়েছে।

 

ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের সুখাইড় গ্রামের কৃষক সুষেন পাল বলেন, ‘নিচু জমি হওয়ায় আমার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। জমিতে কোমরসমান পানি জমেছে। তাই মেশিনে কাটাও যায় না। শ্রমিকের মজুরিও বেশি। মাড়াই খলায় মজুত করা ধানগুলো শুকানোও যাচ্ছে না।’

 

বাগবাড়ি গ্রামের কৃষক হরিধন দাস বলেন, ‘মহা দুশ্চিন্তায় আছি। বৃষ্টির কারণে যেসব ধান কেটেছি সেগুলো শুকানো যায় না, আবার যেগুলো ক্ষেতে আছে সেগুলো গেছে ডুবে। আমাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি।’

 

Manual4 Ad Code

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের সমস্যা নিরসনে কাজ করছে সরকার। ধানকাটার মেশিনের জন্য জ্বালানির সংকট নেই। হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় ধান কাটা চলছে। তাই শ্রমিকের সংকট আছে। বিভিন্ন জেলায় ধানকাটা শ্রমিকের জন্য যোগাযোগ করছে জেলা প্রশাসন।’

 

সিলেট আবহাওয়া অধিদফতরের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, ‘চার দিন সুনামগঞ্জে অস্থায়ীভাবে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া আছে। এর মধ্যে ‍দুদিন গেছে। আগামী দুদিন আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।’

 

(সুরমামেইল/এসডি)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code