৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিতুর মৃত্যু; স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশিত: ১১:১২ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২৬

৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিতুর মৃত্যু; স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা

Manual5 Ad Code

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া এলাকায় আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মিতু আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বামীকে প্রধান আসামি করে তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

রোববার (৩১ মে) রাতে নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলার আসামিরা হলেন- নিহতের স্বামী শাহিনুর রহমান (চান্দু), শ্বশুর মো. মুসলিম উদ্দীন এবং শাশুড়ি মোছা. সাহেরা খাতুন। তারা সবাই সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

 

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের আরাজি রামপুর গ্রামের দেবারু মোহাম্মদের মেয়ে মিতু আক্তারের সঙ্গে বন্দরপাড়া এলাকার শাহিনুর রহমানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই মিতুর ওপর যৌতুকের দাবিতে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হতো। পাশাপাশি তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার দুই পরিবারের মধ্যে বৈঠক হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

 

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শাহিনুর মাদকাসক্ত ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহার দিন দেবারু মোহাম্মদ তার দুই নাতিকে নিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। পরে এক নাতিকে সেখানে রেখে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। দুই দিন পর সকালে শাহিনুরের ভাই শাহিদুল ইসলাম ফোন করে তাকে মিতুর মৃত্যুর খবর দেন। খবর পেয়ে তিনি মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলে পথে জানতে পারেন মরদেহ থানায় নেওয়া হচ্ছে।

 

Manual2 Ad Code

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দিন মিতু বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্বামীর কাছে কিছু টাকা চাইলে শাহিনুর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধর করেন। এ সময় শ্বশুর ও শাশুড়িও যৌতুকের বিষয় নিয়ে গালিগালাজ এবং নির্যাতনে অংশ নেন। দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও সেদিনের ঘটনার একপর্যায়ে মিতু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার কথা বললে স্বামী তাকে আত্মহত্যা করতে উসকানিমূলক কথা বলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

Manual6 Ad Code

 

পরে বিকেলে ঘরের মেঝেতে মিতুকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তাকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে পাঠানো হলেও পরে তাকে মৃত অবস্থায় ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরিয়ে আনা হয়।

Manual5 Ad Code

 

এদিকে, মরদেহ থানায় নেওয়ার পর তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার। তাদের অভিযোগ, রোববার দিনভর ও রাত পেরিয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। পরে সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

 

নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ বলেন, আমার মেয়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আগামী জুন মাসেই তার সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে মেয়ে ও অনাগত নাতিকে হারালাম। যৌতুকের জন্য প্রায়ই তাকে মারধর করা হতো। শাহিনুর নেশা ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য আমার মেয়ের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হতো। অনেকবার বিষয়টি পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা কছি। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সবকিছু সহ্য করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না।

 

তিনি আরও বলেন, মরদেহ বাড়িতে আনার পর গোসল করানোর সময় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমার বুক ফেটে কান্না এসেছে। যে মেয়েকে আমি এত আদর-যত্ন করে বড় করেছি, সেই মেয়েকে এভাবে হারাতে হবে কখনো কল্পনাও করিনি। শুধু আমার মেয়েই নয়, তার গর্ভের নিষ্পাপ সন্তানটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেল। আমি চাই যারা আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

Manual2 Ad Code

 

ঠাকুরগাঁও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, মরদেহটি গতকাল সকালেই থানায় আনা হয়েছিল। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কিছু কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত কারণে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করতে বিলম্ব হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সম্ভবত ডোম বা দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিহতের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

(সুরমামেইল/এমআই)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code