সিলেট ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২৬
নিকোলাস বিশ্বাস :
খেলাধূলা যুগে যুগে মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম এবং সামাজিক সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়েছে। খেলার মাঠের রোমাঞ্চ শুধুমাত্র শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, এটি মানব সম্পর্কের জটিল রসায়নকে সহজ উপায়ে মানুষের সামনে তুলে ধরে। খেলাধূলার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরপেক্ষতা – এটি ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ধার ধারে না। বরঞ্চ, একটি দলের বিজয় বা একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে পারে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের ২৩তম আসর, যা ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ – যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারই প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৪৮টি জাতীয় দল অংশ নিচ্ছে, যার ফলে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বমোট ১০৪টিতে। উত্তর আমেরিকার মোট ১৬টি দৃষ্টিনন্দন শহরে এই ম্যাচগুলো আয়োজন করা হচ্ছে। টুর্নার্মেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচটি মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক -এর নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে জমকালো ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে এই বিশ্বমঞ্চের পর্দা নামবে।
বিশ্বকাপের এই জোয়ার বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। সম্প্রতি মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ৭৮ নং রামারপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের রাস্তায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য ধরা পড়েছে, যা ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশের সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে দুটি বড় মাপের পতাকা – একটি ব্রাজিলের এবং অন্যটি আর্জেন্টিনার – পাশাপাশি টাঙানো হয়েছে। এই ছবি শুধুমাত্র দুটি ফুটবল দলের প্রতীক নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বার্তা বহন করছে। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব কিভাবে এই ধরনের প্রতীকী সম্প্রীতি এবং সামগ্রিকভাবে খেলাধূলা পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতির মতো মৌলিক সামাজিক কাঠামোগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে; পাশাপাশি এর বিপরীত পিঠের উগ্রতা কীভাবে সমাজকে ধ্বংস করে।
কালকিনির দৃশ্যপট এবং এর গুরুত্ব: মাদারীপুরের কালকিনিতে দেখা এই দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে, বিশেষ করে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজ করে, তা অনেক সময় উগ্র রূপ ধারণ করে। বিশ্বকাপ মৌসুমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলে তর্ক-বিতর্ক, যা কখনো কখনো ঝগড়া বা মারামারিতে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে যখন কালকিনির রাস্তায় আড়াআড়িভাবে গাছের সঙ্গে উভয় দলের পতাকা পাশাপাশি টাঙানো হয়, তা একটি নীরব অথচ শক্তিশালী ঘোষণা: প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন ঘৃণা বা বিভেদে পরিণত না হয়। এই পদক্ষেপটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় বাসিন্দারা বোঝেন – বড় উৎসব বা আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন আমরা একে অপরের মত ও পছন্দকে সম্মান করি। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা মানেই অন্য দলের সমর্থকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া নয়। এই শান্ত সহাবস্থানের প্রতীক সামাজিক শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
দেলদুয়ারের সহিংসতা- ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্ধকার দিক: কালকিনির সেই সম্প্রীতির ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ক্রীড়া সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিককে উন্মোচন করে। সেখানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি চরম রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে লাঠিসোঁটা, রামদা এবং দা নিয়ে উন্মত্ত জনতা একটি টিনের বসত-বাড়িতে আক্রমণ চালায় এবং বেপারোয়াভাবে বাড়িটি ভাঙচুর করে। খেলার মতো একটি বিনোদনমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এমন ধ্বংসাত্মক ও হিংস্র তাণ্ডব কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেয়নি, বরং স্থানীয়দের মনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এই দুঃখজনক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, খেলাধূলার প্রতি অতি-আবেগ যখন অন্ধত্বে রূপ নেয়, তখন তা সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে। যে দলগুলো হাজার মাইল দূরে খেলছে, যাদের অধিকাংশ খেলোয়াড় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়, তাদের জন্য নিজের প্রতিবেশী বা দেশের মানুষের ওপর চড়াও হওয়া অত্যন্ত হীন মানসিকতার পরিচয় দেয়। দেলদুয়ারের এই সংঘর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেলাধূলাকে উপভোগের অনুষঙ্গ হিসেবে না দেখে উগ্রতা ছড়ালে তা পরিবার ও সমাজকে কতটা বিপর্যস্ত করতে পারে। এলাকাবাসী ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত এই সংঘাতের সুষ্ঠু সমাধান ও জড়িতদের শাস্তি দাবি করছেন।
পরিবারে খেলাধূলার প্রভাব: পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। খেলাধূলা পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ম্যাচে যখন পুরো পরিবার একসাথে বসে খেলা দেখে, তখন তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়। এটি প্রজন্ম ব্যবধান (Generation Gap) কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। আমরা অনেক সময় দেখি, বাবা ব্রাজিল এবং ছেলে আর্জেন্টিনা সমর্থক। কালকিনির উদাহরণের মতো, পরিবারগুলো যদি শিখতে পারে যে, এই ভিন্নতা শুধুমাত্র একটি খেলা নিয়ে এবং এটি পারিবারিক ভালোবাসার উপরে স্থান পেতে পারে না, তবে পরিবারে শান্তি ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক আড্ডায় সুস্থ আলোচনা এবং সুস্থ কৌতুক পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করে। এটি শিশুদেরকে শিক্ষা দেয় যে, জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অপর পক্ষের সাথে শত্রুতা করতে হবে। খেলাধূলার এই নিরপেক্ষ প্রকৃতি পরিবারগুলোকে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
সমাজে খেলাধূলার প্রভাব: সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং সৌহার্দ্য স্থাপনে খেলাধূলার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি গ্রামে বা শহরে যখন স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন করা হয়, তখন তা সমগ্র সম্প্রদায়কে এক জায়গায় নিয়ে আসে। এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা দলীয় কোন্দল ভুলে একটি সুস্থ বিনোদনের ক্ষেত্র তৈরি করে। কালকিনির ঘটনাটি সামাজিক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজকে বিভক্ত করার বদলে, একটি অভিন্ন সংস্কৃতি আমাদের একত্রিত করতে পারে। এই ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ সামাজিক অসহিষ্ণুতা কমাতে সাহায্য করে। মানুষ যখন দেখে যে তাদের গ্রামের রাস্তায় দুটি দলের পতাকা শান্তিতে পাশাপাশি অবস্থান করছে, তখন তাদের মনেও এই বার্তা পৌঁছায় যে, ভিন্নমতের সাথে বসবাস করা সম্ভব। এটি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ বিনোদন ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ঐক্য জোরদার করে।
রাজনীতি এবং খেলাধূলা: রাজনীতি বা রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে, খেলাধূলা প্রায়শই কূটনীতির একটি অংশ হয়ে ওঠে। যেমন ‘পিং-পং ডিপ্লোম্যাসি’ বা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। কালকিনির এই দৃশ্য স্থানীয় রাজনীতিতে না হলেও, সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। আমরা দেখি রাজনৈতিক কারণে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ এমন একটি সময় যখন রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে মানুষ একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যে বা একটি অভিন্ন আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়। কালকিনির প্রতীকী সম্প্রীতি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সহাবস্থান সম্ভব। যদি দুটি ভিন্ন দেশের সমর্থক (যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম) শান্তিতে থাকতে পারে, তবে কেন একই দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা ভিন্নমত সত্ত্বেও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারবে না? এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে উদারতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব দূর করতে একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, খেলাধূলা শুধুই একটি বিনোদন নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা বাহক। মাদারীপুরের কালকিনিতে পাশাপাশি টাঙানো ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার পতাকা শুধুই একটি বিশ্বকাপ মৌসুমে তৈরি হওয়া সাময়িক দৃশ্য নয়; এটি একটি উন্নত এবং শান্তিকামী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে, দেলদুয়ারের সহিংসতা আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা।
এই চিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভিন্নতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই, কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই একটি মানব সম্প্রদায়ের অংশ। এই প্রতীকী সম্প্রীতি যদি আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতির মতো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি, তবে একটি শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সকলের উচিত কালকিনির এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া, দেলদুয়ারের মতো উগ্রতা পরিহার করা এবং দৈনন্দিন জীবনে ভিন্নমতের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা। খেলাধূলা হোক সম্প্রীতির প্রতীক, বিভেদের নয়।
লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস- একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং ‘জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল’ মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
(সুরমামেইল/এফএ)
প্রধান উপদেষ্টাঃ ফয়েজ আহমদ দৌলত
উপদেষ্টাঃ খালেদুল ইসলাম কোহিনূর
উপদেষ্টাঃ মোঃ মিটু মিয়া
উপদেষ্টাঃ অর্জুন ঘোষ
আইন বিষয়ক উপদেষ্টাঃ এড. মোঃ রফিক আহমদ
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মোহাম্মদ হানিফ
সম্পাদক ও প্রকাশক : বীথি রানী কর
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ফয়সাল আহমদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: কামরুল হাসান
নিউজ ইনচার্জ : সুনির্মল সেন
অফিস : রংমহল টাওয়ার (৪র্থ তলা),
বন্দর বাজার, সিলেট।
মোবাইল : ০১৭১৬-৯৭০৬৯৮
E-mail: surmamail1@gmail.com
Copyright-2015
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি