সিলেটে বন্যা ও পাহাড়ধসের শঙ্কা, প্রস্তুত ৫৩৭ আশ্রয়কেন্দ্র

প্রকাশিত: ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২৬

সিলেটে বন্যা ও পাহাড়ধসের শঙ্কা, প্রস্তুত ৫৩৭ আশ্রয়কেন্দ্র

Manual1 Ad Code

সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছবি : সুরমামেইল


নিজস্ব প্রতিবেদক:
টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখনো অধিকাংশ নদীর পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

 

ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে টানা বর্ষণে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।

 

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। পাশাপাশি জেলার ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে।

Manual6 Ad Code

 

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের প্রয়োজন হলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

 

বুধবার (০৮ জুলাই) বিকালে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আগামী তিন থেকে চার দিন ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে পাহাড়ি ঢলের পানি সিলেটের নদ-নদীতে নেমে এসে পানির স্তর আরও বাড়াতে পারে। ফলে সীমান্তঘেঁষা কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড দেখা দিতে পারে।

Manual7 Ad Code

 

পাউবো জানায়, বর্তমানে অধিকাংশ নদীর পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও অমলশিদ ও কানাইঘাটসহ কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা রয়েছে। তবে উজানের পানি দ্রুত মেঘনা অববাহিকায় নেমে যাওয়ায় সম্ভাব্য বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা কম। নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি দুই থেকে তিন দিনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি সমতল ছিল ১১ দশমিক ১০ মিটার, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ৬৫ মিটার নিচে। একই নদীর সিলেট পয়েন্টে পানি ছিল ৯ দশমিক ০১ মিটার, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ৭৯ মিটার নিচে।

 

কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে পানি ছিল ১২ দশমিক ৫৯ মিটার, যা বিপৎসীমার ২ দশমিক ৮১ মিটার নিচে। শেওলা পয়েন্টে পানি ছিল ১০ দশমিক ৬৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ২ দশমিক ৪০ মিটার নিচে এবং শেরপুর পয়েন্টে ৭ দশমিক ৭০ মিটার, যা বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে।

 

এদিকে সারি-গোয়াইন নদীর সারিঘাট পয়েন্টে পানি ছিল ৯ দশমিক ৮২ মিটার, যা বিপৎসীমার ২ দশমিক ৫৩ মিটার নিচে। পিয়াইন নদীর জাফলং পয়েন্টে পানি ছিল ৯ দশমিক ২০ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩ দশমিক ৮০ মিটার নিচে। তবে গোয়াইন নদীর গোয়াইনঘাট পয়েন্টে পানি সমতল ১১ দশমিক ৫৫ মিটারে পৌঁছে বিপৎসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

 

গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে জকিগঞ্জে। একই সময়ে সিলেটে ৫৭ মিলিমিটার, শেওলায় ৪৯ মিলিমিটার এবং কানাইঘাটে ৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

 

সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ৫২ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া বুধবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আরও ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগজুড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।’

Manual6 Ad Code

 

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, ‘গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অতীতে টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাই প্রশাসনকে আগেভাগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

 

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে টিলা কেটে দুর্বল করে দেওয়ায় ভারী বৃষ্টিতে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। টিলা কাটা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

 

দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘সিলেটে নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কাটা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় কাটার সুবিধার্থে পাদদেশে নিম্নআয়ের মানুষের বসতি গড়ে তোলা হয়। ফলে হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।’

 

তিনি জানান, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক টিলা ধসে শিশুসহ কয়েকজনের প্রাণহানি হয়েছে। এরপর প্রশাসনের তৎপরতা কিছুদিন থাকলেও পরে আবার পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার বলেন, সরকারি হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ টিলার সংখ্যা ১৬০টি হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৮৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে।

 

তিনি বলেন, ‘২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সিলেটে টিলা ধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু অতিবৃষ্টি নয়, নির্বিচারে টিলা কাটার কারণেই ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং টিলা কাটা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘আগামী তিন থেকে চার দিন মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ি ঢল নেমে কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে উজানের পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

 

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি কর্পোরেশন প্রস্তুত রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। নিচু এলাকায় পানি উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।’

 

সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, ‘জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক করতে মাইকিং চলছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে।’

 

তিনি বলেন, ‘জেলায় ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে এবং মাঠ প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code