কালের সাক্ষী সুনামগঞ্জের হুরার কান্দা জামে মসজিদ

প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২৬

কালের সাক্ষী সুনামগঞ্জের হুরার কান্দা জামে মসজিদ

Manual2 Ad Code

নামগঞ্জ সদরের হুরার কান্দা জামে মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত


মেইল ডেস্ক:
হাওর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত সুনামগঞ্জ জেলা। সুনামগঞ্জ জেলা সদর ঐতিহ্যবাহী সুরমা নদীর আবহে চলতি নদী (ধোপাজান) এখন দেশে বালু-পাথর মহাল নামে পরিচিত। আর এই চলতি নদীর পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হুরার কান্দা জামে মসজিদ। হুরার কান্দা নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এ গ্রামটি বর্ষাকালে পানির ওপর ভেসে থাকা একটি ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়।

 

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় মেঘালয় সীমান্ত থেকে বয়ে চলা চলতি নদী (ধোপাজান)-এর পাশে অবস্থিত গ্রাম হুরার কান্দা ও হুরা বিল। এক সময় হুরা বিলে মৎসজীবীরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

Manual5 Ad Code

 

হুরার কান্দা গ্রামের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যাক্তির সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, বৃটিশ শাসন আমলে তাদের পূর্ব পুরুষ এই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

 

Manual6 Ad Code

গ্রামের বাসিন্দা আবু নাছার জানান, গ্রামে তাদের পূর্ব পুরুষ মরহুম হাজি বশির উদ্দিন ও মরহুম কফিল উদ্দিনসহ ৮ ভাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাদের ৮টি ঘর ছিল। এরপর থেকে গ্রামটি বিস্তৃতি লাভ করে। এখন গ্রামে দু’টি মসজিদ, ১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১টি মক্তব রয়েছে।

 

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের হুরার কান্দা গ্রামটি ছিল একটি বন জঙ্গল (কান্দা)। কান্দাটি উজাড় করে সেখানে তারা বাড়িঘর নির্মাণ করেছিলেন। আর গ্রামের পাশে হুরা নামে বিল ছিল। মেঘালয় পাহাড় থেকে বয়ে আসা প্রবল স্রোতের টানে পরবর্তীতে পাড় ভেঙ্গে এই হুরার বিলটি নদীতে পরিণত হয়। পাহাড় থেকে স্রোতের টানে নদীতে প্রচুর পরিমাণ বালু ও পাথর আসতো। ওই সময় থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ বালু-পাথর সংগ্রহ করে বিক্রি করতো। পরবর্তীতে বালু-পাথর বিক্রি করাই হয়েছিল তাদের প্রধান জীবিকা।

 

Manual6 Ad Code

নদীর পাড়ে অবস্থিত গ্রামীণ অবকাঠামোতে গড়ে উঠা এই গ্রামটি ধীরে ধীরে উন্নত হয়। কৃষিকাজের পাশাপাশি, বালু উত্তোলন বারকী শ্রমিকদের জীবিকা উপার্জনের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা-দীক্ষায়ও এগিয়ে যায় তারা।

 

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল ওয়াহাব (৯০) জানান, ১৯৪৮ সালে যখন গ্রামের জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে তখন গ্রামের বাসিন্দা মরহুম উসমান গণী একটি মসসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এমনকি তিনি মসজিদের জন্য জায়গাও দান করেছিলেন। একটা সময় মসজিদটি নির্মাণের জন্য গ্রামের সবাই উদ্যোগী হয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। আজও এই মসজিদটি গ্রামবাসী সংরক্ষণ করে রাখছেন।

Manual8 Ad Code

 

দূর থেকে মসজিদটি দেখলে মনে হয় মিনি তাজমহল। কাছে গিয়ে অনুভব করা যায় আগেকার মানুষ কত আগ্রহ সহকারে নিপুণ স্থাপতশৈলীর এ অপূর্ব মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

 

জানা যায়, মসজিদ নির্মাণের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ইট তৈরির কারিগর নিয়ে এসেছিলেন এলাকাবাসী। সিলেট থেকে রাজমিস্ত্রী এনে ইট ও সুরকি দিয়ে মসজিটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটির ভিতরে মনে হয় যেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। যা আজও সবার দৃষ্টি কাড়ে।

 

দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন। নদী ভাঙনে মসজিদটিও হুমকির মুখে রয়েছে। গ্রামের মানুষ তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে মসজিদের চর্তুদিকে নিজ খরচে গার্ডওয়াল নির্মাণ করেন। এ মসজিদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী হাওর সংস্কৃতি মিশে আছে।

 

২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় মসজিদটি পুরোপুরি ডুবে যায়। যা দেখার জন্য ও নিউজ কাভারেজের জন্য রাজধানী থেকে সাংবাদিকসহ অনেক মানুষ এসেছিলেন। বর্ষাকালে হুরার কান্দা গ্রামটির চারপাশ পানিতে তলিয়ে থাকে এবং গ্রামগুলোকে পানির ওপর ভাসমান ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। এটি জেলার একটি নিচু এলাকা। এখানকার মানুষ প্রধানত ধান চাষ, বালু আহরণ এবং মাছ ধরার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

 

বর্ষাকালে নৌকাই যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এবং শুকনো মৌসুমে রাস্তা দিয়েও যাতায়াত করেন গ্রামের লোকজন। জেলার অন্যান্য এলাকার মতোই এখানে মরমী সংস্কৃতি ও হাওর পারের সহজ-সরল জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে মানুষজন জীবন যাপন করেন।

 

চলতি নদীর পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী হুরার কান্দা জামে মসজিদটি আজও দৃষ্টি কাড়ে মানুষের। পবিত্র রমজান মাসে মজিদে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় মসজিদের বারান্দায় নামাজ আদায়ের জন্য টিনসেড দিয়ে বর্ধিত করা হয়েছে।

 

এলাকাবাসী এ ঐতিহ্যবাহী হুরার কান্দা জামে মসজিদটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি।

 

মুফতি মাওলানা আজিজুল হক জানান, আমাদের পূর্ব পুরুষও এই গ্রামে বাস করতেন, পরবর্তীতে তারা পাশ্ববর্তী গ্রাম মুসলিমপুরে চলে যান। তবে মসজিদটির স্মৃতি ধরে রাখা আমাদের সবার কর্তব্য।

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code