জগন্নাথপুরের প্রভাবশালী মুক্তিযোদ্ধা এখন ভিক্ষুক!

প্রকাশিত: ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০১৯

জগন্নাথপুরের প্রভাবশালী মুক্তিযোদ্ধা এখন ভিক্ষুক!

Manual4 Ad Code

মো. শাহজাহান মিয়া, জগন্নাথপুর : সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে এক সময়ের প্রভাবশলী ব্যক্তি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইন এখন ভিক্ষাবৃত্তি করছেন। যা অভাবে কিংবা স্বভাবে কোন অবস্থায় মেনে নিতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। রূপ কথার গল্পের মতো। একজন বাদশা কিভাবে ফকির হয়। এরকম ঘটনা ঘটেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইনের জীবনে। মানুষের কিসের এতো অহংকার। কথায় আছে ‘সকাল বেলার ধনীরে তুই ফকির সন্ধ্যা বেলায়।’ বিধাতার সেই নিয়তি বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

 

জানাযায়, ১৯৪৭ সালে জগন্নাথপুর পৌর শহরের ছিলিমপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম গ্রহন করেন সাজ্জাদ হোসাইন। বাল্যকালে ও ছাত্র জীবনে সাজ্জাদ হোসাইন বিলাসী জীবন-যাপন করেছেন।

 

১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যুদ্ধের আহবানে সাড়া দিয়ে সিলেট এমসি কলেজের ২৬ বছর বয়সের ছাত্র নেতা সাজ্জাদ হোসাইন দেশ স্বাধীনের যুদ্ধে অংশ নিতে প্রশিক্ষণের জন্য চলে যান ভারতের বালাট ক্যাম্পে। সেখানে কয়েক মাস প্রশিক্ষণ নেয়ার পর মাতৃভূমি রক্ষায় দেশ স্বাধীনের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সাজ্জাদ। এ সময় বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও হিন্দিসহ কয়েকটি ভাষায় পারদর্শী এবং সৎ সাহসী হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সাজ্জাদ হোসাইনকে কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেন। প্রতিটি প্লাটুনে ৩৬ জন করে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সাজ্জাদ হোসাইন ছিলেন ৬ প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধার কোম্পানী কমান্ডার। কমান্ডার সাজ্জাদ হোসাইনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে সুনামগঞ্জের চিনাকান্দি এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন। পরে জগন্নাথপুর এসে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে জগন্নাথপুর থেকে পাক বাহিনী পালিয়ে গেলে জগন্নাথপুর মুক্ত হয়।

Manual5 Ad Code

 

দেশ স্বাধীনের পর অপ্রতিরোধ্য প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইন। দেশব্যাপী রয়েছে যার নাম ও খ্যাতি। এ সময় তাঁর প্রভাবে এলাকার অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছেন। আবার অনেক মানুষের ক্ষতি হয়েছে। তাঁর প্রভাবে ঘটেছে অনেক ঘটনা-রটনা। যে কারণে এখনো কিছু মানুষ তাঁকে পছন্দ করলেও অনেক মানুষ পছন্দ করেন না। এর মধ্যে ২০০৩ সালে জগন্নাথপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাজ্জাদ হোসাইন।

 

ব্যক্তি জীবনে সাজ্জাদ হোসাইন বিয়ে করেননি। নেই তার সংসার। একাকী ঘরের একাকীত্ব জীবন। এক গ্লাস পানি এনে দেয়ার মতো লোক নেই। তাঁর ভাতিজা ফয়জুর রহমান ২ বেলা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। যদিও সাজ্জাদ হোসাইনের ২ বোন ১ ভাতিজা যুক্তরাজ্যে ও ১ বোন ও ১ ভাতিজা বেলজিয়ামে বসবাস করেন। অজ্ঞাত কারণে তাঁরা সাজ্জাদ হোসাইনকে কোন আর্থিক ভাবে সহযোগিতা করেন না বলে সাজ্জাদ হোসাইন জানান।

 

Manual3 Ad Code

একটি দুর্ঘটনা প্রভাবশালী বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইনকে আজ পথে বসিয়ে দিয়েছে। ২০০৪ সালে জগন্নাথপুরে ট্রলি ও রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে রিকশাটি দুরের খাদে গিয়ে ছিটকে পড়ে রিকশায় থাকা যাত্রী সাজ্জাদ হোসাইন মাথায় গুরুত্বর আঘাত পেয়ে আহত হন। আহত সাজ্জাদ হোসাইন একটানা ২ মাস সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর তাঁকে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেফার করা হয়।

 

Manual5 Ad Code

সেখানে চিকিৎসকরা জানান, সাজ্জাদ হোসাইনের মাথায় ব্রেন হেমারেজ হয়েছে। মাথার ভেতরে জমে থাকা রক্ত অপারেশনের মাধ্যমে বের করতে খরচ লাগবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। অপারেশনের আগ পর্যন্ত নিয়মিত সেবনের জন্য কিছু ওষুধ লিখে দেয়া হয়। প্রথমে বিষয়টিকে পাত্তা দেননি সাজ্জাদ হোসাইন। ওষুধ খেয়ে না খেয়ে দিব্যি চলেছেন।

 

তবে, গত ২ বছর ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। এরপর থেকে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন তাঁকে ওষুধগুলো খেতে হয়। এর মধ্যে প্রভাব ও বিত্তশালী সাজ্জাদ হোসাইন ভিখারি হয়ে গেছেন। এখন অপারেশন করানো তো দুরের কথা, নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার টাকাও তার নেই। যে কারণে এক সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি সাজ্জাদ হোসাইন বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তি করে ওষুধের টাকা জোগাড় করছেন। অন্য ভিখারিরা ছেড়া জামা-কাপড় ও হাতে থালা নিয়ে ভিক্ষা করলেও সাজ্জাদ হোসাইন এখনো শার্ট-প্যান্ট পরিধান করে খালি হাতে ভিক্ষাবৃত্তি করেন। প্রতিদিন অফিসপাড়া ও হাট-বাজারে বিভিন্ন জনের কাছে হাত পাততে গিয়ে তিনি অঝোর ধারায় কাঁদছেন। নিজ চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না। এ হচ্ছে দুনিয়ার উত্থান-পতন।

 

সোমবার (০৭ অক্টোবর) দুপুরে সরজমিনে দেখা যায়, জগন্নাথপুর মুক্তিযোদ্ধা ভবনের সামনে ব্যবসায়ী আবদাল মিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইনকে ১০ টাকা ভিক্ষা দিচ্ছেন। তা দেখে এ প্রতিবেদক উক্ত প্রতিবেদনটি লিখতে উৎসাহী হন এবং উপস্থিত অনেক পরিচিত পথচারী জনতা আক্ষেপ করে বলেন, এটি দুনিয়ার উত্থান-পতন। মানুষের কিসের এতো অহংকার। সকাল বেলার ধনীরে তুই ফকির সন্ধ্যা বেলা।

 

এ সময় ৬৮ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইন (মুক্তিবার্তা নং ০৫০২৩০০৬৫) আক্ষেপ করে বলেন, কাদের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলাম। স্বাধীন দেশের সুবিধাকে পাওয়ার কথা আর পাচ্ছে কে।

 

তিনি বলেন, প্রতি মাসে সরকারি ভাবে ১২ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পাই। তা দিয়ে আমার ওষুধের খরচ হয় না। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ থেকে ৫শ’ টাকার ওষুধ লাগে। এছাড়া অন্য খরচ তো রয়েই গেল। আমার প্রবাসী স্বজনরাও সাহায্য করে না। যে কারণে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করছি।

 

তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, আমি বাঁচতে চাই। মরে গেলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চাই না।

 

তিনি সরকারসহ সকলের কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়ে বলেন, আপনারা দয়া করে আমার মোবাইল-০১৭১৫-২৩৭৭৭১ নাম্বারে যোগাযোগ করে আর্থিক সাহায্য কামনা করছি।

Manual1 Ad Code

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জগন্নাথপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল কাইয়ূম বলেন, সাজ্জাদ হোসাইনের ভিক্ষাবৃত্তির কারণে আমরা সমাজে লজ্জা পাই। বলেন, তিনি অভাবে নয়, স্বভাবে ভিক্ষা করেন।

 

ছিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাজী আবদুল জব্বার বলেন, সাজ্জাদ হোসাইন স্বভাব দোষে ভিক্ষা করেন। এতে আমাদের লজ্জা হয়।

 

তবে সচেতন মহলের অনেকে বলেন, অভাবে-কিংবা স্বভাবে হোক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার ভিক্ষাবৃত্তি কোন অবস্থায় মেনে নেয়া যায় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code