ধর্ষণ !

প্রকাশিত: ৪:০৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০১৬

ধর্ষণ !

Manual1 Ad Code
Taslima

তসলিমা নাসরিন

কিছুদিন আগে তনু নামের একটি উনিশ বছরের মেয়েকে কুমিল্লার সেনানিবাসে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে কিছু সচেতন মানুষ। অনেকে আশঙ্কা করছেন সেনারাই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। অনেকে আবার ধর্ষণের পক্ষেও মত দিচ্ছে, কেউ কেউ বলছে, হিজাবের আড়ালে তনু এক নর্তকী ছিল, সুতরাং তার ধর্ষণ আর মৃত্যুর জন্য সে নিজেই দায়ী। কেউ কেউ আবার এও বলছে। মোহাম্মদ আসিফ নামের এক সেনা তো ফেসবুকে লিখেছে, তনু একটা খারাপ মেয়ে ছিল, সুতরাং তাকে ধর্ষণ করাটা উচিত কাজ ছিল।

তনুর হিজাব তনুকে ধর্ষণ থেকে বা খুন হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি। পুরুষ যখন মেয়েদের নির্যাতন করে, তারা মেয়েদের পোশাক দেখে করে না। তারা মনে করে নির্যাতন করার অধিকার তাদের আছে, সে কারণেই করে নির্যাতন। যদি শৈশব থেকে মানুষকে শিক্ষিত করা হয় মেয়েরা মানুষ, মেয়েরা যৌনবস্তু নয়, তাহলে দেখা যায় সেই সমাজে মেয়েদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখলেও পুরুষ মনে করে না, তাদের কোনও রকম অশালীন মন্তব্য করার বা তাদের স্পর্শ করার অধিকার কোনও পুরুষের আছে। অসভ্য সমাজে পুরুষরা, নারী যে পোশাকই পরুক না কেন, নারীকে যৌন হেনস্তা করে। সভ্য সমাজে পুরুষরা, নারী যে পোশাকই পরুক না কেন, নারীকে যৌন হেনস্তা করে না। খুব সম্ভবত সেনাবাহিনীর লোকরা ধর্ষণ করেছে তনুকে। রক্ষকরা কী যে অনায়াসে ভক্ষক বনে যেতে পারে! মেয়েদের জন্য সম্ভবত ‘নিরাপত্তা’ এখন আর অধিকার নয়, নেহাতই  লাক্সারি। আজকাল যারা ধর্ষণ করে তারা ধর্ষণ করাটা অন্যায় জেনেই ধর্ষণ করে। মানুষ যত সভ্য হয়েছে, ধর্ষণের সংজ্ঞা তত পাল্টেছে। একসময় ধর্ষণকে কোনও অপরাধই বলে মনে করা হতো না। বাংলাদেশের মতোই অবস্থা ভারতে।

Manual7 Ad Code

‘১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে এক পাল পুরুষ বীভৎসভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলেছে’। — এই খবরটি ভারতের নানা বয়সের, নানা শ্রেণির অর্ধলক্ষ লোককে জানাবার পর শতকরা ৭০ ভাগ বলল, ‘পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলো’। বাইশ ভাগ বলল, ‘মুত্যুদণ্ড দাও’। আট ভাগ ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বললো, ‘what about the menz?’, ‘পুরুষদেরও তো মেয়েরা ধর্ষণ করে, তার বেলা?’, ‘মেয়েটা নিশ্চয়ই  পুরুষদের প্রভোক করার জন্য গায়ে কিছু পরেছিল, বা কিছু মেখেছিল’। এদের কাছে ধর্ষণের সমাধান মূলত দুটো,–মেরে ফেলো, বা কেটে ফেলো। এ দুটো শাস্তি ধর্ষকদের দিলেই নাকি ধর্ষণের ইতি ঘটে। ইতি তো ঘটেইনি, বরং আকাশ ছুঁয়েছে। ধর্ষক ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হওয়ার পর পর পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষণ বেড়ে গিয়েছিল।

যে সব দেশে ধর্ষণ সবচেয়ে কম ঘটে, সেসব দেশে পুরুষাঙ্গ কর্তন বা মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি নেই। তবে সেসব দেশে মেয়েদের মর্যাদা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। মেয়েদের স্বাধীনতা এবং অধিকার সেসব দেশে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি, সেসব দেশে মেয়েরা শিক্ষিত, মেয়েরা স্বনির্ভর, সংরক্ষিত আসনের সুযোগ ছাড়াই সংসদ সদস্যের পঞ্চাশ ভাগই মেয়ে।

ধর্ষণই বহাল তবিয়তে চলে সেসব দেশে, যেসব দেশের বেশিরভাগ পুরুষ মেয়েদের ভোগের বস্তু, দাসি-বাঁদি, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, বুদ্ধিশুদ্ধিহীন প্রাণী, নিচুজাতের জীব ইত্যাদি হিসেবে বিচার করে; যেসব দেশে পতিতালয় গিজগিজ করছে, শত শত বাচ্চা-মেয়েকে যৌনপাচারের শিকার করা হচ্ছে; যৌন হেনস্তা, ধর্ষণ, স্বামীর অত্যাচার, পণের অত্যাচার, পণ অনাদায়ে খুন– এই দুর্ঘটনাগুলো প্রতিদিন ঘটছে, ঘটেই চলছে।

Manual2 Ad Code

ধর্ষণ আর যা কিছুই হোক, যৌন সঙ্গম নয়। ধর্ষণ কেউ যৌন-ক্ষুধা মেটানোর জন্য করে না। প্রায় সব ধর্ষকেরই স্থায়ী যৌনসঙ্গী আছে। ধর্ষণ নিতান্তই পেশির জোর, পুরুষের জোর, আর পুরুষাঙ্গের জোর। মোদ্দা কথা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পরম পূজনীয় পুরুষাঙ্গের ন্যাড়া মাথায় মুকূট পরানো বা বিজয় নিশান ওড়ানোর আরেক নাম ধর্ষণ।

Manual6 Ad Code

ধর্ষণ বন্ধ হবে কবে অথবা কী করলে ধর্ষণ বন্ধ হবে? এই প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর, ‘যেদিন পুরুষ ধর্ষণ করা বন্ধ করবে, সেদিনই বন্ধ হবে ধর্ষণ’। কবে কখন বন্ধ করবে, সে সম্পূর্ণই পুরুষের ব্যাপার। সম্মিলতভাবে সিদ্ধান্ত নিক যে এই দিন থেকে বা এই সপ্তাহ থেকে বা এই মাস থেকে বা এই বছর থেকে নিজের প্রজাতির ওপর  ভয়াবহ বীভৎস এইসব নির্যাতন তারা আর করবে না।

ধর্ষণ বন্ধ করার পথে এগোতে হলে কী কী করতে হবে! রাস্তাঘাটে অফিসে আদালতে দোকান পাটে মেয়েদের যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হবে,  বাল্যবিবাহ,পণপ্রথা, জাতপাত বন্ধ করতে হবে, মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে, স্বনির্ভর করতে হবে। স্কুলের শুরু থেকেই  নারী-পুরুষের সমানাধিকারের শিক্ষা সব শিশুকে দিতে হবে। শিশুরা ভালো শিক্ষা আর ভালো পরিবেশ পেলে  মানুষ ভালো হয়। ধর্ষকদের জীবন-কাহিনী ঘাঁটলে দেখা যায় বেশির ভাগেরই বিচ্ছিরি একটা শৈশব ছিল, ভালো শিক্ষা দীক্ষা বলতে কিছুই ছিল না, মারামারি দেখতে দেখতে, ঘৃণা দেখতে দেখতে, পৌরুষিক পাষণ্ডতা দেখতে দেখতে   বড় হয়েছে। এগুলোই শিখেছে। শেখা সহজ, না-শেখা সহজ নয়। শিখে ফেলা তন্ত্র-মন্ত্র-পুরুষতন্ত্র আর নারীবিরোধী-কুসংস্কারগুলো যে করেই হোক ‘না-শেখা’ বা ‘আনলার্ন’এর ট্র্যাশক্যানে ফেলতে হবে।

দেশকে ধর্ষণমুক্ত করতে গেলে সরকারকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। তার চেয়ে ধর্ষককে ফাঁসি দেওয়ার মতো সহজ কাজ আর কিছু নেই। জনগণও খুশি হয়। তখনকার মতো সব সমস্যাকে চমৎকার ধামাচাপা দেওয়া যায়। সরকার এভাবেই মানুষকে বোকা বানায়। মানুষ বুদ্ধিমান হয়ে গেলে বেজায় মুশকিল! তখন যে কাজগুলো করলে সমাজের সত্যিকার ভালো হয়, সে কাজগুলোর দাবি সরাসরি সরকারের কাছে করে বসবে বুদ্ধিমান মানুষেরা। ওদের দাবি মেনে সমাজকে সবার জন্য নিরাপদ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে ভোট জোটানোর মতলব আঁটবে কে? একে ল্যাং মারা, ওকে দেশছাড়া করা, গণ্ডা গণ্ডা গুণ্ডা পোষা আর যুগের পর যুগ গদিতে বসে থাকার ফন্দি আঁটার সময় কোথায় তখন সরকারের?

Manual5 Ad Code

ধর্ষণটা না হলে হয়তো খুনটা হতো না। ধর্ষণ কমে গেলে খুনও একদিন কমে যাবে। তনুকে যারা খুন করেছে, তাদের নাকি আজও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুঁজে পেতে ইচ্ছে না করলেই খুঁজে পাওয়া যায় না। নাস্তিক ব্লগারদের কারা খুন করেছে, তা আজও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সমাজের অধিকাংশ মানুষ যাদের ঘৃণা করে, তারা খুন হলে মানুষ একরকম খুশিই হয়, খুনীর বিচার চেয়ে চিৎকার চেচামেচি করে না। চোর ছ্যাঁচড় নাস্তিক নারী সবাইকে ঘৃণা করার একটা বদভ্যাস দাঁড়িয়ে গেছে মানুষের।

জানি সেনারাও আর সবার মতো মানুষ। তারাও পুরুষ। তাদেরও ধর্ষণেচ্ছা জাগে। ধর্ষণ এবং খুন করার অধিকার শুধু অ-সেনাদেরই আছে, সেনাদের সে অধিকার নেই, তা তো নয়! একটা পুরুষকে খুন করা আর একজন নারীকে খুন করা—দুটো আলাদা। পুরুষকে খুন করলে খুনীকে দোষ দেওয়া হয়, নারীকে খুন করলে নারীকে দোষ দেওয়া হয়। নারী পুরুষের বৈষম্য যতদিন না নির্মূল হচ্ছে, ততদিন এই হিপোক্রেসি থাকবেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code