সিলেট ২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০১৯
সুরমা মেইল ডেস্ক : একাত্তরে গাইবান্ধা সদরে অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট, হত্যা ও দেশেত্যাগে বাধ্য করার মত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে বাবা-ছেলেসহ পাঁচ আসামির ফাঁসির রায় এসেছে যুদ্ধাপরাধ আদালতে।
বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) এ মামলার রায় ঘোষণা করে।
সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন- মো. রঞ্জু মিয়া, আবদুল জব্বার মণ্ডল, তার ছেলে মো. জাছিজার রহমান খোকা, মো. আবদুল ওয়াহেদ মণ্ডল ও মো. মনতাজ আলী বেপারি ওরফে মমতাজ।
তাদের মধ্যে কেবল রঞ্জু মিয়া রায়ের সময় আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন, বাকিরা মামলার শুরু থেকেই পলাতক।
পাঁচ আসামির সবাই গাইবান্ধা সদর উপজেলার নান্দিনা ও চক গয়েশপুর গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে তারা সবাই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ নিয়ে তারা রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখান এবং ওই এলাকার বিভিন্ন গ্রামে যুদ্ধাপরাধ ঘটান বলে উঠে এসেছে এ মামলার বিচারে।
১৭৬ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত বলেছে, আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা চারটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগেই আসামিদের দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “তাদের অপরাধ বিবেচেনা করে আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে; এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।”
অন্যদিকে আসামি রঞ্জু মিয়ার আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, “আমরা সংক্ষুব্ধ। কারণ আমার যিনি মক্কেল, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৪ বছর। শান্তিবাহিনী গঠন বা রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মত বয়স তখন তার ছিল না।”
আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসানই এ মামলার পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন।
তাদের বিষয়ে আবুল হাসান বলেন, “রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে তাদের এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ আদালতে যাব।”
নিয়ম অনুযায়ী, রায়ের এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন আসামিরা। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে পলাতকদের আগে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত রায় আসা ৪০টি মামলার ১০২ জন আসামির মধ্যে ছয়জন বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মোট ৯৪ জনের সাজা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৭ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার রায় এসেছে।
এ মামলায় মোট আসামি ছিলেন ছয়জন। তাদের মধ্যে আজগর হোসেন খান মামলার তদন্ত চলাকালেই মারা যান। ২০১৮ সালের ১৭ মে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বাকি পাঁচ আসামির যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।
আসামিদের মধ্যে গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুল জব্বার মণ্ডলের বয়স এখন ৯০ বছর। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই তিনি জামায়াতে ইসলামীতে সক্রিয় ছিলেন।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে শান্তি কমিটি এবং রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। পরে জেলা সদরের শাহপাড়া ইউনিয়নের রাজাকার বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পান।
তার ছেলে জাছিজার রহমান ওরফে খোকার বসয় ৬৫ বছর। বাবার মত তিনিও জামায়াতে ইসলামীতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গাইবান্ধা জেলা সদরে যে নৃসংশতা চালায়, তাতে রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন তিনি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে দালাল আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বাবা-ছেলে দুজন। কিন্তু তখন তাদের বিচার হয়নি।
পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে জাছিজার পুলিশে যোগ দেন, ২০১৪ সালে তিনি অবসর নেন।
এছাড়া আসামি মো. আব্দুল ওয়াহাব মণ্ডল, মো. মনতাজ আলী বেপারী ওরফে মমতাজ এবং মো. রঞ্জু মিয়াও একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয় মামলার অভিযোগপত্রে।
মামলা বৃত্তান্ত :
গাইবান্ধার ছয় আসামির বিরুদ্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হয় ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর। প্রসিকিউশনের আবেদনে ২০১৬ সালের ২৯ মে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তার আগেই সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি মো. রঞ্জু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ওই বছরের ২৭ জুলাই তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
২০১৭ সালের ৭ মার্চ তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন প্রসিকিউশনে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তার আগেই ২০১৬ সলের ৩ ডিসেম্বর আসামি মো. আজগর হোসাইন খান মারা যান। ফলে ২০১৭ সলের ৯ মার্চ প্রসিকিউশন আজগরকে বাদ দিয়ে বাকি ৫ আসামির বিরুদ্ধে ট্রাব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। প্রসিকিউশন ও আসামি পক্ষের আইনজীবীর শুনানির পর গত বছরের ১৭ মে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
কোন অভিযোগে কার সাজা
১। ১৯৭১ সালের ১৪ জুন সকাল ১০টার দিকে আসামিরা হেলাল পার্ক আর্মি ক্যাম্প থেকে এসে গাইবান্ধা সদর থানার বিষ্ণুপুর গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালায়।
তারা অম্বিকা চরণ সরকারের বাড়িতে ঢুকে তাকে বন্দি করে অমানবিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের পর অম্বিকা চরণকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাওয়ার সময় আসামিরা বাড়িতে লুটপাট চালায়।
আসামিরা সেদিন একই গ্রমের দ্বিজেন চন্দ্র সরকার ও আব্দুল মজিদ প্রধানকে তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে এবং তাদের বাড়িতে লুটপাট চালায়।
ওই গ্রামের ফুল কুমারী রানী ও তার ননদ সাধনা রানী সরকারকে (বর্তমনে মৃত) আটক করে জোর করে ধর্মান্তরিত করে আসামিরা।
এছাড়া আব্দুল মজিদ প্রধান ও দ্বিজেন চন্দ্র সরকারকে সেদিন ধরে গাইবান্ধা পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে হত্যা করা হয়। আসামিরা সাহাপাড়া ইউনিয়নের তিন থেকে চারশ হিন্দু লোকজনকে দেশত্যাগ করাতে বাধ্য করে।
এ অভিযোগে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটতরাজ, হত্যা, দেশত্যাগে বাধ্য করার দায়ে পাঁচ আসামি রঞ্জু, জব্বার, খোকা, ওয়াহেদ ও মমতাজকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।
২। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে আসামিরা ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে গাইবান্ধা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা গ্রামে হামলা চালায়।
তারা ওই গ্রামের আবু বক্কর, তারা আকন্দ, আনছার আলী এবং নছিম উদ্দিন আকন্দকে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।
এছাড়া একই গ্রামের সামাদ মোল্লা, শাদা মিয়া, ফরস উদ্দিন ও সেকান্দার আলী মোল্লাকে বাড়ির সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়। ৪০ থেকে ৫০টি বাড়ির মালামাল লুট করারর পর সেগুলো পুড়িয়ে দেয় আসামিরা।
এ অভিযোগে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার দায়ে জব্বার, খোকা, ওয়াহাব ও মমতাজকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
৩। ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর আসামিরা ২৫ জন সশস্ত্র রাজাকার ও ৩০ জন পাকিস্তানি সেনাকে নিয়ে জেলা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে লাল মিয়া বেপারী, আব্দুল বাকী এবং খলিলুল রহমান, দুলাল মিয়া, মহেশ চন্দ্র মণ্ডলকে হত্যা করে।
এ ঘটনায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামি জব্বার, খোকা, ওয়াহাব ও মমতাজকে প্রাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
৪। ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর আসামিরা জেলা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা, মিরপুর, সাহারবাজার, কাশদহ, বিসিক শিল্প নগরী, ভবানীপুর ও চকগায়েশপুর গ্রামে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, ইসলাম উদ্দিন এবং নবীর হোসেনসহ মোট সাতজনকে গুলি করে হত্যা করে।
এ ঘটনায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার দায়ে পাঁচ আসামির সবাইকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে আদালত।
প্রধান উপদেষ্টাঃ ফয়েজ আহমদ দৌলত
উপদেষ্টাঃ খালেদুল ইসলাম কোহিনূর
উপদেষ্টাঃ মোঃ মিটু মিয়া
উপদেষ্টাঃ অর্জুন ঘোষ
আইন বিষয়ক উপদেষ্টাঃ এড. মোঃ রফিক আহমদ
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মোহাম্মদ হানিফ
সম্পাদক ও প্রকাশক : বীথি রানী কর
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ফয়সাল আহমদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: কামরুল হাসান
নিউজ ইনচার্জ : সুনির্মল সেন
অফিস : রংমহল টাওয়ার (৪র্থ তলা),
বন্দর বাজার, সিলেট।
মোবাইল : ০১৭১৬-৯৭০৬৯৮
E-mail: surmamail1@gmail.com
Copyright-2015
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি