সিলেট ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০১৮
‘বাক বাকুম পায়রা, মাথায় দিয়ে টায়রা, বউ সাজবে কাল কি, চড়বে সোনার পালকি।’ ছড়াটিতে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পালকি সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।বাংলাদেশে এক সময় অভিজাত শ্রেণীর মানষ এই পালকি নামক মানবযান ব্যবহার করতেন। তা ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালকি ব্যবহার ছিলো ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এর মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল উল্লেখ করার মতো।আবহমান বাংলার অন্যতম ঐতিহ্য এ পালকি চড়ে নববধূর শ্বশুরবাড়ি আগমন ছিল একটি অলিখিত রেওয়াজ। কিন্তু তা আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন হারিয়ে গেছে দেশের প্রাচীন ও লোক-ঐতিহ্যের বাহন পালকি। পালকি ঘিরে কত হাসি তামাশার গল্প আজ ও শোনা যায় দাদা-দাদি বা মায়ের কাছ থেকে তা নিতান্তই রোমাঞ্চকর বটে।নানা ঘটনার সাক্ষী এই পালকি আজ হারিয়ে গেছে।
এখন গ্রাম-গঞ্জে আগের মতো আর পালকির ব্যবহার চোখে পড়ে না। শুধু জাদুঘরেই শোভা পাচ্ছে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাহন পালকি।এক সময় গ্রাম বাংলার সবুজ শ্যামল মেঠোপথে বসবাসকারি জনগোষ্ঠির বিয়ে অনুষ্ঠানে পালকির প্রাধান্য ছিল বেশি।বিয়েতে পালকি ছাড়া বিকল্প কোন মাধ্যম ছিল না।
পালকির সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের জীবন-যৌবনের অনেক মধুময় স্বপ্ন। গাঁয়ের পথে পালকিতে করে নববধূ নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে যুবতি মেয়েরা উঁকি-ঝুঁকি মারত। পালকির মধ্যে বসা বউকে দেখে তারাও হারিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে রাজকুমারকে নিয়ে। পালকিতে তুলে বউকে নিয়ে গ্রাম বাংলার সবুজ শ্যামল মেঠো পথে চলতো। তবে কেউ কেউ গরুর গাড়ি করে নববধূকে তুলে আনতো।তখন গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে যেত। মানব চাকা ব্যবহার করে পালকি চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা ,মাইলের পরম মাইল। বর্তমানে সেই আনন্দ, ঐতিহ্য গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে গেছে।আর এই জন্যই পালকিকে অভিজাত শ্রেণির বাহন হিসেবে গণ্য করা হতো।কোথায় হারিয়ে গেল সেই সময়।
আগেকার দিনে নতুন বধূ নাইয়র যেত রঙিন কাগজে সাজানো পালকিতে চড়ে। এখনকার বধূরা আর পালকিতে চড়ে লাজ-রাঙা মুখে শ্বশুরবাড়ি যায় না। আমাদের সেই সবুজ গ্রাম, নববধূ সবই আছে, শুধু নেই পালকি।
আগে গ্রামে পালকি ব্যবসা ছিল জমজমাঠ কিন্তু যুগের কারণে ধীরে ধীরে তা হারিয়ে গেছে।
তৎকালীন মুসলিম সমাজ ব্যবস্থা এবং বাঙালি সংস্কৃতিতে পালকির অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। মুসলিম সম্প্রদায় মেয়েদের পর্দা রক্ষার জন্য পালকিতে চড়ে অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে বাড়ির যেত। আগে বিত্তশালী পরিবারগুলোতে নিজস্ব পালকি ও নিজস্ব বেয়ারা থাকতো। আর নিম্নবিত্তরা তাদের বউ, মেয়েদের আনা নেওয়ার জন্য পালকি ভাড়া করতো। অন্য সব বাহনে চলাফেরার চেয়ে বিয়ে-শাদিতে পালকির ব্যবহার অপরিহার্য ছিল। নতুন বধূকে নিয়ে বেয়ারারা নানা ধরনের সুখ-দুঃখে গান গেয়ে দুলকি চলতো। যুগ পাল্টে গেছে। রাজা নেই, বাদশা নেই, নেই পালকি বেয়ারারা। এখনকার নববধূরা পালকিতে করে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার স্বপ্ন আর দেখে না। তারা এখন জাঁকজমকভাবে সাজানো কার গাড়িতে করে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যায়। তবে সেইদিন আর দূরে নেই যেদিন আমাদের নতুন প্রজন্মরা পালকি নামক মানুষের ঘাড়ে চড়ে বসা কোনো বাহনের কথা বই পুস্তকে পড়বে এবং লোকশিল্প জাদুঘরে গিয়ে সাজানো গোছানো কৃত্রিম পালকি দেখবে।
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি