পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে ওসমানী ছিলেন না কেন?

প্রকাশিত: ২:৩১ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৮, ২০১৮

পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে ওসমানী ছিলেন না কেন?

Manual1 Ad Code

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সবচেয়ে বড় সংখ্যক সৈনিকের আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক ঘটনা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর থেকে শুরু করা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি ১৬ ডিসেম্বরে এসে পরিণতি লাভ করে। সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের দলিলে বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪.৩১ মিনিটে ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী সই করেন। সেদিনের অনুষ্ঠানে আমাদের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী ছিলেন না। এ নিয়ে পড়ে অনেক সমালোচনাও হয়। কিন্তু কেন তিনি ছিলেন না সেদিন?

উপরের প্রশ্নের জবাবের আগে আত্মসমর্পণ দলিলে কী লেখা ছিল তা জেনে নিই। দলিলের লেখা ছিল ইংরেজি এবং তার অনুবাদ হল-

পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।

Manual2 Ad Code

এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট-জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলীর অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।

স্বাক্ষর/ জগজিৎ সিং অরোরা
(লেফটেন্যান্ট-জেনারেলজেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফপূর্ব রণাঙ্গনে ভারত ও বাংলা দেশ যৌথ বাহিনী
স্বাক্ষর// আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি
(লেফটেন্যান্ট-জেনারেলসামরিক আইন প্রশাসক অঞ্চল বি অধিনায়ক পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড পাকিস্তান)

‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ’ গ্রন্থে জেনারেল (লে. কর্নেল) কে. এম সফিউল্লাহ লেখেন, ‘‘লে. জেনারেল নিয়াজী শর্তাবলিতে ২টা ৪৫ মিনিটে অনুস্বাক্ষর করলে আত্মসমর্পণ দলিলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের সময়সূচি নির্ধারিত হয় ৪টা ৩০ মিনিট। ১টা ৪৫ মিনিটে ডেমরায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বেলা ২টায় ডেল্টা সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং আমাকে (সফিউল্লাহ) জানায় মিত্র বাহিনীর ৫৭তম মাউন্টেন ডিভিশন থেকে তার কাছে বার্তা এসেছে— বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে স্বাগত জানানোসহ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য।’’

‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে সিদ্দিক সালিক লিখলেন, ‘‘বিকেলের শুরু হতেই জেনারেল নিয়াজী গাড়ি করে ঢাকা বিমানবন্দরে গেলেন ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। তিনি পত্নীকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে এলেন। এক বিপুল সংখ্যক বাঙালি ছুটে গেল তাদের ‘মুক্তিদাতা’ ও তার পত্নীকে মাল্যভূষিত করতে। নিয়াজী তাকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিলেন এবং করমর্দন করলেন। সে ছিল এক হূদয়স্পর্শী দৃশ্য। বিজয়ী এবং বিজিত দাঁড়িয়ে আছে প্রকাশ্যে বাঙালির সামনে। আর বাঙালিরা অরোরা’র জন্য তাদের গভীর ভালোবাসা এবং নিয়াজীর জন্য তীব্র ঘৃণা প্রকাশে কোনরূপ গোপনীয়তার আশ্রয় নিচ্ছে না। উচ্চকণ্ঠে চিত্কার ও স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাদের গাড়ি রমনা রেসকোর্স-এ এলো। সেখানে আত্মসমর্পণের জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয়। বিশাল ময়দানটি বাঙালি জনতার উদ্বেগ আবেগে ভাসছিল। তারা প্রকাশ্যে একজন পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলের অবমাননার দৃশ্য দেখবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল।’’ সিদ্দিক সালিক ছিলেন নিয়াজির জনসংযোগ কর্মকর্তা।

জেনারেল নিয়াজি তার ‘দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে লিখেছেন,
“১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। মেজর জেনারেল ফরমান ও এডমিরাল শরীফ এ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। আমি (নিয়াজি) কম্পিত হাতে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করি। তখন আমার অন্তরে উত্থিত ঢেউ দু’চোখ বেয়ে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানের একটু আগে একজন ফরাসি সাংবাদিক এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন আপনার অনুভূতি কী, টাইগার? জবাবে বললাম, আমি অবসন্ন’। অরোরা আমার পাশেই ছিলেন।”

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব তার ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব আ নেশন’ বইয়ে লিখেছেন, ‘‘পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ না করে সেনানিবাসে তার সদর দপ্তরেই আত্মসমর্পণের ব্যাপারে চাপাচাপি করছিলেন। সেটা যে কেবল জনসমক্ষে অবমাননা এড়ানোর জন্য, তা নয়। এর পেছনে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর চিন্তাও কাজ করেছিল। এই ভীতি যে খুব অমূলক ছিল, তাও নয়।’’

কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম) তার ‘স্বাধীনতা ৭১’ বইয়ে লিখেছেন, ‘‘ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর নিয়াজিকে বহনকারী গাড়ি যখন লাখ লাখ জনতার ভিড় ঠেলে রেসকোর্স ময়দানের দিকে এগোচ্ছিল, তখন একাধিকবার সেই বহরের গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষিপ্ত জনতা নিয়াজিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বলছিল, ‘নিয়াজিকে আমাদের হাতে দাও। ও খুনী। ও আমাদের লক্ষ লক্ষ লোক মেরেছে, আমরা ওর বিচার করব।’’

Manual5 Ad Code

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর না থাকার বিষয়টি নিয়ে মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার লিখেছেন, ‘‘ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার কর্নেল পি এস দাস অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে তার ব্যক্তিগত সচিব ফারুক আজিজ খানের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠেয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমপর্ণের খবর জানান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানীর খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন যে কর্নেল ওসমানী, ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত (ভারতীয় বাহিনী) এবং লেফট্যানেন্ট কর্নেল আব্দুর রব মুক্ত এলাকা পরিদর্শনে সিলেট গেছেন। কর্নেল ওসমানী ১৩ ডিসেম্বর সিলেটের মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনের পরিকল্পনা করেন। যাত্রার আগে তাঁকে আমি বলেছিলাম, স্যার আপনার এখন কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না। দ্রুতগতিতে যুদ্ধ চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।’ কর্নেল ওসমানী তার পরিকল্পনা পরিবর্তন না করে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।’’

তবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর না থাকার বিষয়টিতে তার যেমন অনুশোচনা ছিলো না। তিনি বরং গুজবকারীদের প্রতি বিরাগ ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে না থাকার বিষয়ে তখন কিছু যুক্তি তুলে ধরেন ওসমানী। শোনা যাক সেই বয়ান- “দেখুন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোনো চেতনা এখনও জন্ম হয়নি। আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়ানোর সুযোগটা কোথায়? কোনো সুযোগ নেই। তার অনেক কারণ রয়েছে। নাম্বার ওয়ান- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবে আত্মসমর্পণ করবে আমি জানতাম না। আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব এসেছে। নাম্বার টু- ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টের পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল স্যাম মানেকশ। সত্যি কথা হচ্ছে আমি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানও নই। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। কারণ বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ নয়।

Manual1 Ad Code

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করবেন লে. জে. অরোরা। জেনারেল মানেকশ গেলে তার সঙ্গে যাওয়ার প্রশ্ন উঠতো। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশর সমান। সেখানে তার অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা দেমাগের কথা নয়। এটা প্রটোকলের ব্যাপার। আমি দুঃখিত, আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের বড় অভাব। ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী আমার কমান্ডে নয়। জেনারেল মানেকশর পক্ষে জেনারেল অরোরার কমান্ডের অধীন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে যৌথ কমান্ডের ভারতীয় বাহিনীর কাছে। আমি সেখানে (ঢাকায়) যাবো কি জেনারেল অরোরার পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার জন্য? হাও ক্যান আই! আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করবেন জেনারেল মানেকশর পক্ষে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজী। এখানে আমার ভূমিকা কি? খামোখা আমাকে নিয়ে টানা হ্যাচড়া করা হচ্ছে।’’ সূত্র : পূর্বপশ্চিম

Manual3 Ad Code

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code