‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ সোহ্‌রাওয়ার্দীর জন্মদিন আজ

প্রকাশিত: ২:৪১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯

‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ সোহ্‌রাওয়ার্দীর জন্মদিন আজ

Manual8 Ad Code

১৯৪৭ সালের আগে ভারত এবং পাকিস্তানের পাশাপাশি অখণ্ড একটি স্বাধীন বাংলার ‘ডোমিনিয়ন রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন যিনি, তিনি হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। যাকে বলা হয় ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত বাঙালি রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। আজ রোববার এই মানুষটিরে ১২৭তম জন্মদিন।

Manual1 Ad Code

তিনি ১৮৯২ সালের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর পিতা ছিলেন বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দি। জাহিদ সোহরাওয়ার্দি কলকাতা হাইকোর্টের একজন খ্যাতনামা বিচারক ছিলেন। মা ছিলেন নামকরা উর্দু সাহিত্যিক খুজাস্তা আখতার বানু। তার দাদা ছিলেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ স্যার আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ছিলেন তার পিতামাতার কনিষ্ঠ সন্তান।

Manual3 Ad Code

হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় পরিবার থেকে। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে। এর পরে যোগ দেন সেইন্ট জ্যাভিয়ার্স কলেজে। তিনি সেখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।এরপর মায়ের অনুরোধে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক অর্জন করেন। এখানে তিনি আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেন এবং বিসিএল ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯১৮ সালে গ্রে’স ইন হতে বার এট ল ডিগ্রী অর্জন করেন। এবং ১৯২১ সালে কলকাতায় ফিরে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হন।

তিনি ছিলেন এক প্রতিভাবান রাজনৈতিক সংগঠক। বিশ শতকের বিশের দশকে কলকাতা খেলাফত কমিটির সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। একজন শ্রমিকনেতা হিসেবে কলকাতায় রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু করে তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে নাবিক, রেলকর্মচারী, পাটকল ও সুতাকল কর্মচারী, রিক্সাচালক, গাড়িচালক প্রভৃতি মেহনতি মানুষের প্রায় ৩৬টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলেন।

সোহ্‌রাওয়ার্দীর ১৯২৬ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৯ সালে পরবর্তী অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের সময় তিনি বেঙ্গল মুসলিম ইলেকশন বোর্ড নামে অপর একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পূর্বে সোহ্‌রাওয়ার্দী কলকাতায় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন এবং নিজে এই দলের সম্পাদক হন। আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ভারতের মুসলমানদের একটি সর্বভারতীয় সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সোহ্‌রাওয়ার্দী জিন্নাহর আহবানে সাড়া দিয়ে নিজের নবগঠিত দল নিয়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

প্রধানত সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাংগঠনিক শক্তির সুবাদেই মুসলিম লীগ ভারতের সর্বমোট ১১ প্রদেশের মধ্যে কেবল বাংলায় সাফল্য অর্জন করে। ১২১ টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৯টি আসন পায় মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনে সমর্থ হয়। ১৯৩৭-৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী সমগ্র প্রদেশে দলকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন বাংলায় মুসলিম লীগের স্থপতি। হক-বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে তথাকথিত শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার (১৯৪১-১৯৪৩) পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বিস্ময়কর বিজয়ের রূপকারও ছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ১২১টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে জিতেছিল ১১৪টি আসনে। এ বিজয়কে অনেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে মুসলমানদের রায় বলে মনে করেন, আর এই বিচারে সোহ্‌রাওয়ার্দীও ছিলেন জিন্নাহ্র সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম  স্রষ্টা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সোহ্‌রাওয়ার্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ দল গঠনে তিনি কলকাতা থেকে তার পূর্ববঙ্গীয় সমর্থকদের পরামর্শ ও সাহস যুগিয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৭ বছরের মধ্যে ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রাদেশিক পরিষদের সর্বমোট ৩০৯ আসনের মধ্যে মাত্র ৯ আসন লাভ করে। নির্বাচনের এই ফলাফলেও সোহ্‌রাওয়ার্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এন.ডি.এফ) গঠন করে তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের আইয়ুব-বিরোধী সম্মিলিত জোটের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

Manual2 Ad Code

বিভাগপূর্বকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় বরাবরই তৎপর ছিলেন। ১৯৩২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে তিনি মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি তাদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থারও অটল সমর্থক ছিলেন। জিন্নাহর উদ্যোগে ১৯৪৬ সালের ৭-৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম আইন প্রণেতাদের কনভেনশনে গৃহীত আনুষ্ঠানিক  সিদ্ধান্তের প্রস্তাবকও ছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস (১৬ আগস্ট ১৯৪৬) পালনকালে কলকাতায় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ হিসেবে পরিচিত এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়।

ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাক্কালে সোহ্‌রাওয়ার্দী সমগ্র বাংলা, আসাম ও বিহারের মানভূম, সিংভূম ও সম্ভবত পূণির্য়া জেলা সমন্বয়ে পূর্বভারতে ‘বৃহৎ বাংলা’ নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। একথা সর্ববিদিত যে, ভারত বিভাগের প্রাক্কালে বাংলা প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সোহ্‌রাওয়ার্দী শরৎচন্দ্র বসু, কিরণ শংকর রায়, সত্যরঞ্জন বক্শি প্রমুখ হিন্দু নেতাদের সহযোগে ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি অখন্ড স্বাধীন বাংলা নামে তৃতীয় একটি ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম এতে সর্বাত্মক সমর্থন যুগিয়েছিলেন। এ প্রয়াস সফল হয় নি।

Manual1 Ad Code

দেশবিভাগের পর অন্যদের সঙ্গে সোহ্‌রাওয়ার্দী তখনই পাকিস্তানে আসেননি। তিনি কলকাতায় থেকে যান এবং গান্ধীর সঙ্গে শান্তি মিশনের কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। অপরদিকে, মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক তথা নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্ণধারদের সঙ্গে কখনোই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল না। সে কারণে ১৯৪৯ সালে সোহ্‌রাওয়ার্দী পাকিস্তানের স্থায়ী বাসিন্দা নন এ অজুহাতে লিয়াকত আলী খানের সরকার পাকিস্তানের গণপরিষদ থেকে সোহ্‌রাওয়ার্দীর সদস্য পদ খারিজ করে দেয়।

ভারত ও বাংলা বিভাগের পর সার্বিকভাবেই একটি ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সোহ্‌রাওয়ার্দীর দৃষ্টিতে অতঃপর পূর্ববাংলার স্বাধীন অস্তিত্বের আর কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি সম্মিলিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় সমঅধিকার ও ক্ষমতার সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাঙালি ও অবাঙালি সমস্যার সমাধানের পথকেই যথার্থ বলে ভেবেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সমতার নীতি এবং পশ্চিম পাকিস্তান এক ইউনিট গঠনের একান্ত সমর্থক ছিলেন।

সোহ্‌রাওয়ার্দী সাংবিধানিক শাসনে দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলেন; আর এ কারণেই তিনি ১৯৫৪ সালে দলীয় আপত্তি উপেক্ষা করে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। তিনি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আইনমন্ত্রী থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দীর বলিষ্ঠ ও উদ্যোগী ভূমিকার সুবাদেই পাকিস্তানের দুই অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ১৯৫৫ সালে মারী চুক্তি সম্ভব হয় এবং এই চুক্তি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নের পথ সুগম করে।

সোহ্‌রাওয়ার্দী একজন বাস্তববাদী রাজনীতিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। বিভাগপূর্ব কালে বাংলার মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণে তিনি তাদের জন্য পৃথক নির্বাচনের একজন গোঁড়া সমর্থক ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি সাধারণ জাতীয়তা গড়ে তোলার জন্য যৌথ নির্বাচনের পক্ষে মত দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাসও হয়। সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code