সিলেটের ছয়টি এলাকাকে ইসিএ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

প্রকাশিত: ১:০৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২৬

সিলেটের ছয়টি এলাকাকে ইসিএ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

Manual2 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
সিলেটের ছয়টি এলাকাকে পরিবেশগত সঙ্কটাপূর্ণ এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

 

এগুলো হচ্ছে- কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর, শাহ আরেফিন টিলা, উত্তমছড়া, কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া, জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর ও লালাখাল।

 

সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এসব এলাকাগুলোতে চলছে অবাধে বালু ও পাথর লুট। অনিয়ন্ত্রিত পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে পর্যটনকেন্দ্রটির সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে পরিবেশও।

 

সংশ্লিস্টরা মনে করছেন, ইসিএ ঘোষণার ফলে এই এলাকাগুলো থেকে বালু-পাথর লুটপাট বন্ধ হবে এবং পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, কেবল ঘোষণা করলেই হবে না, সরকারী নজরদারিও বাড়াতে হবে। তা না হলে লুটপাটকারীদের ঠেকানো যাবে না।

Manual1 Ad Code

 

এরআগে ২০১৫ সালে সিলেটের আরেক পর্যটন কেন্দ্র গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংকে ইসিএ ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী ইসিএ ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা। তবে এখন পর্যন্ত ইসিএ বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে বন্ধ হয়নি বালু-পাথর লুট।

Manual7 Ad Code

 

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার সিলেটের কয়েকটি কোয়ারি থেকে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেয়। বৈধভাবে উত্তোলন বন্ধ হলেও তবে বন্ধ হিনি লুটপাট।

 

গত বছর কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর থেকে পাথর লুটের বিষয়টি দেশজুড়ে আলোড়ন তুলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে সাদাপাথরে শুরু হয় নজিরবিহীন লুটপাট। এতে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়ে ধলাই নদীর উৎসমুখ এই পর্যটন এলাকা।

 

Manual8 Ad Code

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের নেতাদের হাতে চলে যায়, যার ফলে প্রকাশ্যে উত্তোলন শুরু হয়।

 

২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছে যে, জাফলং, শাহ আরেফিন টিলা, ভোলাগঞ্জ, উত্তমছড়া, শ্রীপুর, বিছনাকান্দি এবং লোভাছড়ায় ধ্বংসাত্মক পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এই এলাকাগুলোকে ইসিএ (ECA) হিসেবে ঘোষণা করা হবে না।

 

এর আগে ২০১৪ সালে, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির দায়ের করা একটি রিট আবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট সিলেটের পাথর খাদগুলো থেকে যান্ত্রিক উপায়ে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে।

 

এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, পাথর ব্যবসায়ীরা নির্ভরশীল শ্রমিকদের জীবিকা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা উল্লেখ করে বারবার খাদগুলো পুনরায় খোলার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

 

একই উপজেলার সরকারি খাস খতিয়ানে ১৩৭ দশমিক ৫০ একর জায়গাজুড়ে শাহ আরেফিন টিলার অবস্থান। আড়াই দশক আগেও এখানে উঁচু বড় আকারের দুটি টিলা ছিল। কিন্তু নির্বিচারে পাথর লুটের ফলে এখন আর টিলা অবশিষ্ট নেই। বরং স্থানে স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

 

Manual7 Ad Code

ইসিএ ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া সিলেটের বাকী এলাকাগুলোরও একই অবস্থা।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রাকৃতিক সম্পদ মূল্যায়ন এবং ইসিএ-এর সম্ভাব্য পরিধি নির্ধারণের জন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি পাওয়া গেলেই অধিদপ্তর সংরক্ষণের জন্য ইসিএ ঘোষণার পদক্ষেপ নেবে।’

 

পরিবেশ কর্মীরা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও সিলেটে পূর্বে ঘোষিত ইসিএগুলোতে দুর্বল প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট জেলা শাখার সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, জাফলং-ডাউকি নদীর উভয় তীরের ৫০০ মিটার এলাকাকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘নতুন এলাকাগুলোকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়ায় সাধুবাদ জানাই। তবে এমন উদ্যোগ অনেক আগেই করা উচিত ছিল। কারণ এখন শাহ আরেফিন টিলাকে এখন ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করলে এর জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব, কারণ পাথর উত্তোলনের কারণে এই পাহাড়টি ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে।

 

কিম বলেন, এখন ইসিএ ঘোষণা হলেও তা যেনো কেবল কাগজে-কলমেই না থাকে।

 

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী, পরিবেশ বিভাগ ইসিএ ঘোষণা করার এবং এই ধরনের এলাকায় বাসস্থান ধ্বংস, মাটি ও জলের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন, দূষণকারী শিল্প স্থাপন, জলাশয়ে বর্জ্য নিঃসরণ এবং পাথর ও অন্যান্য খনিজ উত্তোলনের মতো কার্যকলাপ সীমিত করার ক্ষমতা রাখে। বর্তমানে, দেশে ১৩টি ইসিএ রয়েছে।

 

১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সিলেট-৫ আসনের খেলাফত মজলিসের সাংসদ মোহাম্মদ আবুল হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টুর কাছে সিলেটের পাথর কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে তা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চান।

 

আবুল হাসান বলেন, দেশে পাথরের সরবরাহ কম থাকায় ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে এবং এই খাতের শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছেন।

 

জবাবে আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, জাতীয় উন্নয়নের জন্য পাথর উত্তোলন পুনরায় শুরু করার কোনো সুযোগ বর্তমানে নেই।

 

তিনি বলেন, ‘যেহেতু এই পাথরখনি এলাকাগুলোর পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে, তাই সিলেটের বেশ কয়েকটি স্থানকে ইসিএ (ECA) হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code