কক্সবাজারে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গাসহ ১৯ জনের মৃত্যু

প্রকাশিত: ১০:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০২৬

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গাসহ ১৯ জনের মৃত্যু

Manual3 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
টানা বর্ষণে কক্সবাজারে গত চার দিনে মোট ৫০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, বন্যা পরিস্থিতি এবং পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। টানা বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট দুর্যোগে পাহাড়ধসে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারমধ্যে ১৬ জন রোহিঙ্গা এবং ৩ জন স্থানীয় নাগরিক।

 

বুধবার (৮ জুলাই) কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত চার দিনের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হলো, রোববার ২৪০ মিলিমিটার, সোমবার ১২৯ মিলিমিটার, মঙ্গলবার ৬৯ মিলিমিটার এবং বুধবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত আরও ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চার দিনে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০৬ মিলিমিটার।

 

এদিকে টানা বৃষ্টিপাতের ঘটনায় কক্সবাজারে ৭টি পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারমধ্যে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪টি পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদরের সাত্তারঘোনা, দরিয়ানগর বড়ছড়া এবং পেকুয়ায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকেই হতাহত হয়েছে।

 

সর্বশেষ বুধবার (৮ জুলাই) বেলা ৩টার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর ব্লক এ-৭/৩ এলাকায় ৮ শিশু নিহত হয়েছে।

 

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি জানান, ক্যাম্প-৫ পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন ঘটনাস্থলেই এবং অপর ৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

 

অবশিষ্ট ৫ জন শিশুকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।

Manual4 Ad Code

 

এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় ৮ জন নিহত হন।

 

রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ধসে মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন।

Manual1 Ad Code

 

একই রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

 

পরে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনায় চারজন নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)।

 

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মানবিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

 

এদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাত্তার ঘোনা এলাকায় সোমবার গভীর রাতে পাহাড়ধসে আলী আকবর (৫০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

 

নিহতের ছেলে আরাফাত হোসেন জানান, রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে পাহাড়ের মাটি তাদের টিনের ঘরের ওপর ধসে পড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় আলী আকবরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

অন্যদিকে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের আলম্ম্যার ঝিরি এলাকায় সোমবার বিকেলে পাহাড়ধসে মোহাম্মদ মিনহাজ (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শিশুটির নানী জান্নাতুল ফেরদৌস।

Manual1 Ad Code

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেল ৩টার দিকে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা একটি বসতঘরের ওপর মাটি ধসে পড়লে ঘটনাস্থলেই মিনহাজের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত জান্নাতুল ফেরদৌসকে উদ্ধার করে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

 

স্থানীয় ইউপি সদস্য মনজুর আলম ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

অন্যদিকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় নাছিমা আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন ও পরিবারের আরেক সদস্য গুরুতর আহত হন।

 

নিহতের ভাই মনির আলম জানান, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতেন তারা। টানা বৃষ্টির কারণে হঠাৎ পাহাড়ধস নেমে ঘরের ওপর মাটি এসে পড়লে পরিবারের তিন সদস্য আহত হন। পরে তাদের দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক নাছিমা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত জসিম উদ্দিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অপর আহত শিশুটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান জানান, চলমান দুর্যোগ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে নিয়ে জরুরি সভা করা হয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রশাসন মাঠে কাজ করছে। তিনি বলেন, “প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে কেউ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

এদিকে অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রতিকূল আবহাওয়া আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

 

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব সাইক্লোন শেল্টার (আশ্রয়কেন্দ্র) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Manual4 Ad Code

 

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০১৮৭২-৬১৫১৩২-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

 

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code