সিলেট ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৬, ২০১৭
ভগবান শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব সনাতন ধর্মালম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এ উৎসব উৎযাপিত হয়ে থাকে। রথযাত্রা মহোৎসব এখন শুধু সনাতন ধর্মালম্বীদের উৎসব হিসেবে নয়। ইহা এখন সার্বজনীন উৎসব সারা বিশ্বে ব্যাপক উৎসাহ উদ্বীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে থাকে। নয়দিন ব্যাপি অনুষ্টিত এ মিলন মেলার পরিসমাপ্তি ঘটে উল্টো রথযাত্রার মধ্য দিয়ে। শাস্ত্রে বর্ণিত আছে যে, ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব ঐ সময়ে তাঁর বড় ভাই বলদেব (বলরাম) এবং ছোট বোন সুভদ্রা মহারাণীসহ রথে আরোহণ করে নীলাচল থেকে মাসীর বাড়ী সুন্দরাচলে বেড়াতে যান। নয়দিন সুন্দরাচলে অবস্থান করে পুনরায় নীলাচলে প্রত্যাবর্তন করেন। যা উল্টো রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত। শ্রী মন্দির ছেড়ে ভগবান শ্রী জগন্নাথদেব লোকালয়ে বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, যাহাতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবাই যেন তাঁকে দর্শন করে বিশেষ কৃপা লাভ করতে পারে। এ সমন্ধে স্কন্ধ পুরাণে বর্ণিত আছে যে, ঐ সময়ে যিনি ভগবানের শ্রী বিগ্রহের দর্শন লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন, তিনি সহ¯্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করে থাকেন।
‘জগন্নাথ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ (জগৎ+নাথ=জগতের নাথ বা প্রভু)। সংস্কৃত ভাষায় জগত অর্থে বিশ্ব এবং নাথ অর্থে ঈশ্বর বোঝায়। সুতরাং জগন্নাথ শব্দের অর্থ হল জগতের ঈশ্বর বা জগদ্বীশ্বর। ভগবান শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই একটি বিশেষ রূপ। ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যিনি জগতের নাথ বা জগদীশ্বর। যিনি গৌর তিনিই কৃষ্ণ আবার উনিই জগন্নাথ রূপে আর্বিভূত হয়েছেন। সত্তা একই শুধু রূপটা ভিন্ন। চারিযুগে ভগবান চারটি ভিন্ন রূপ ও বর্ণ নিয়ে আর্বিভূত হয়েছিলেন। সত্যযুগে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম চতুর্ভুজ বিষ্ণুরূপে (নরহরি) বর্ণ ছিল পীত বর্ণ। সত্যযুগে দেখিনু প্রভু ওহে নরহরি/শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম চতুর্ভুজধারী।
ত্রেতাযুগে দেখি তোমায় ধনুক বাণধারী/পিতৃসত্য পালিবারে হইলায় বনাচারী। ত্রেতাযুগে ধনুকবাণধারী রামচন্দ্র রূপে (ক্ষত্রিয়) বর্ণ ছিল রক্ত বর্ণ। দ্বাপর যুগে দেখিনু প্রভু ত্রিভঙ্গধারী/শিরে শোভা ময়ূরপুচ্ছ হাতে বাঁশরী। দ্বাপর যুগে ত্রিভঙ্গধারী মূরলীধর শ্যামসুন্দর রূপ আর বর্ণ ছিল জলভরা মেঘ বর্ণ। কলিযুগে এলেন প্রভু গৌরাঙ্গ রূপেতে/ঘরে ঘরে ‘মহামন্ত্র’ নাম বিলাইতে। কলিযুগে রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যরূপ। দুই অঙ্গে এক অঙ্গ তিনিই হলেন গৌরাঙ্গ বর্ণ ছিল গৌর বর্ণ (স্বর্ণের মত উজ্জ্বল)। চারিযুগে ভগবান চারটি ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করার উদ্দ্যেশ্য ছিল, তাঁর সৃষ্ট জীবের মঙ্গল সাধন। অর্থাৎ দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন। ভগবানের জগন্নাথ রূপটি সবচেয়ে বেশি কৃপালু। যে কেউ এই রূপ দর্শনে জগন্নাথদেবের বিশেষ কৃপা লাভ করতে পারে। এজন্যই জগন্নাথ দেব শ্রীমন্দির ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন যাতে সবাই সহজে তাঁর দর্শন লাভ করে বিশেষ কৃপা প্রাপ্ত হয়।
যাহোক এবার সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানব রথযাত্রা মহোৎসবের ইতিকথা ও জগন্নাথদেবের প্রকাশ সম্পর্কে। রথযাত্রা উৎসব অনেক প্রাচীন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর অনেক ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে দ্রাবিড়ের সর্ব দক্ষিণের অংশ পান্ড্যদেশে ‘পান্ড্য বিজয়’ নামে এক রাজা ছিলেন। সেই রাজার একজন বিষ্ণু ভক্ত পুরোহিত ছিলেন। তার নাম ছিল দেবেশ্বর। রাজা পান্ড্য তাঁর সেই পুরোহিতের উপদেশানুসারে শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের সেবা পূজার পুন:প্রবর্তন করেন। এতো গেল খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর কথা। বর্তমান অবধি এ ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা মহারাণীর রথারোহণ কার্যকে পান্ডু বিজয় বলে অভিহিত করা হয়।
যাহোক এতক্ষণ আমরা রথযাত্রার ঐতিহাসিক পটভূমি জানলাম। এবার আসা যাক রথযাত্রার পৌরাণিক বর্ণনায়। ভবিষৎপুরাণে বর্ণিত আছে যে, সত্যযুগে প্রহ্লাদ মহারাজ প্রথম মহাবিষ্ণুর রথ টেনে ছিলেন। তারপর দেবতা, সিদ্ধ, গন্ধর্বগণও রথযাত্রার অনুষ্টান করেছিলেন। প্রাচীনকালে কোন কোন স্থানে কার্তিক মাসে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার কথা শোনা যায়। কিন্তু ‘বিষ্ণুধর্ম’ তে এই পবিত্র উৎসব আষাঢ় মাসের পুষ্যা নক্ষত্রযুক্তা শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই জগন্নাথদেবের রথযাত্রার বিধি নির্ণয় করা হয়েছে। তাই এই তিথিতেই রথযাত্রা অনুষ্টান করা কর্তব্য। পদ্মপুরাণে ও বলা হয়েছে আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়াতে রথযাত্রা করে শুক্লা একাদশীর দিন পুনর্যাত্রা করতে হয়। অর্থাৎ উল্টো রথযাত্রা। এই মহোৎসবে যাঁরা রথে উপবিষ্ট ভগবান শ্রী জগন্নাথদেবকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে দর্শন করেন তাঁদের বিষ্ণুলোকে বাস হয়। দর্শনে মুক্তিলাভ ফলে সে ব্যক্তির আর পুর্নজন্ম হয় না।
এবার পুরাণের আলোকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে দেখে নেয়া যাক জগন্নাথদেবের প্রকাশ সম্পর্কে। ভগবান শ্রীজগন্নাথ দেবের রূপ নিয়ে অনেকেই অনেক মন্তব্য করে থাকে। জগন্নাথদেব হস্তপদহীন খোড়া কেন? কিন্তু ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবের এমন রূপের পেছনে নিগূঢ় রহস্যময় কারণ রয়েছে। ভগবান জগন্নাথদেব কেন এমন রূপ নিয়ে আর্বিভূত হলেন সে সম্পর্কে পুরাণে অতীব সুন্দর একটি উপাখ্যান রয়েছে। বস্তুত জগন্নাথদেবের এই রূপ আদৌ বিকৃত বা অসম্পূর্ণ নয়। পুরাণে বর্ণিত আছে যে, একবার মহিষীগণ (দ্বারকার রাণীরা) ভগবানের বৃন্দাবন লীলা অর্থাৎ ভগবানের বাল্যলীলা জানার জন্য কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। কিন্তু মহিষীগণ ভেবে পাচ্ছিলেন না যে, ভগবানের শিশুরূপে বৃন্দাবনে যে লীলা করেছিলেন সেই লীলা কথা কে তাঁদেরকে বলতে পারে? অবশেষে তাঁরা জানতে পারলেন যে, মাতা রোহিণীদেবী ভগবানের শৈশবলীলা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করেছিলেন। তাই একমাত্র তিনিই তাঁদেরকে ভগবানের বৃন্দাবন লীলা শ্রবণ করাতে পারবেন। এই বলে মহিষীগণ মাতা রোহিণী দেবীর কাছে গিয়ে কৃপাপূর্বক ভগবানের বৃন্দাবন লীলা শ্রবণ করানোর জন্য আহ্বান করলেন। রোহিণীদেবী রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন যে এই লীলাকাহিনী যাতে কোনভাবেই কৃষ্ণ বলরাম শ্রবণ করতে না পারে। যদি তাঁরা শ্রবণ করে তবে বড় আকারের সমস্যার সূচনা হবে। এই কথা বলে মাতা রোহিণীদেবী একটি বড় প্রশস্ত কক্ষে মহিষীগণদের সম্মুখে ভগবানের বাল্যলীলা বর্ণনা করছেন। আর এদিকে কৃষ্ণ বলরাম যাতে করে এই লীলা শ্রবণ করতে না পারে সেজন্য দ্বাররক্ষী হিসেবে সুভদ্রা মহারানীকে নিযুক্ত করলেন। যাহাতে কৃষ্ণ বলরামের আগমন হলে রোহিণী মাতাকে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতে পারেন। সবাই প্রবল আগ্রহ নিয়ে রোহিণী মাতাকে ঘিরে বসলেন ভগবানের বাল্যলীলা শ্রবণ করতে। আর এদিকে সুভদ্রা মহারাণী কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন দুই হাত প্রশস্ত করে যাতে কেউ কক্ষে প্রবেশ করতে না পারে বিশেষ করে কৃষ্ণ বলরাম। মাতা রোহিণীদেবী ভগবানের বাল্যলীলা বর্ণনা করছেন আর মহিষীগণ প্রবল মনোযোগে তা শ্রবণ করছেন। সবাই যেখানে শ্রবণ করছেন সেখানে সুভদ্রা মহারাণী কি করে থাকেন। তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে ভগবানের বাল্যলীলা শ্রবণে নিমগ্ন। শ্রবণে নিমগ্ন সবার বাহ্যজ্ঞান লোপ পেল।
এদিকে, কৃষ্ণ বলরাম কখন যে দ্বারে এসে সুভদ্রা মহারাণীর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তা সুভদ্রা মহারাণী টেরই পান নি। কৃষ্ণ বলরাম ও এসে তাঁদের নিজেদের বাল্যলীলা শ্রবণের দ্বারা ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন। তাঁদের চোখদ্বয় ক্রমশ বড় ও বিস্ফোরিত হতে শুরু করল তাঁদের হস্ত ও পদ দেহের মধ্যে সংকুচিত হওয়ায় কৃষ্ণ-বলরাম ও সুভদ্রা মহারাণীর কলেবর কুর্মাকৃতি ধারণ করল। ঠিক এই সময়ে নারদমুনি উপস্থিত হলেন এবং ভগবানের এমন রূপ দর্শন করতে পারছিলেন।
যখন তিনি কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার পাশে গেলেন তখন তাঁদের তিন জনের বাহ্য চেতনা ফিরে এল। তখন নারদমুনি ভগবানকে বিনীত ভাবে প্রার্থনা করলেন যে, আপনাদের এই দিব্য রূপ ধরণীর কোথাও প্রকাশিত করুণ যাতে প্রত্যেকেই আপনাদের এই দিব্য শুভ রূপ দর্শন করে বিশেষ কৃপা ও আনন্দ লাভ করতে পারে। পরবর্তীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নারদমুনির অভিলাষ পূর্ণ করেছিলেন তাঁর এক ভক্তের মাধ্যমে পুরীধামে জগন্নাথরূপে আর্বিভূত হয়ে। যেই গৌর সেই কৃষ্ণ সেই জগন্নাথ, নীলাচলে মহাপ্রভু জয় জগন্নাথ।
ছড়াকার ও কলাম লেখক : সজল চন্দ
প্রধান উপদেষ্টাঃ ফয়েজ আহমদ দৌলত
উপদেষ্টাঃ খালেদুল ইসলাম কোহিনূর
উপদেষ্টাঃ মোঃ মিটু মিয়া
উপদেষ্টাঃ অর্জুন ঘোষ
আইন বিষয়ক উপদেষ্টাঃ এড. মোঃ রফিক আহমদ
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মোহাম্মদ হানিফ
সম্পাদক ও প্রকাশক : বীথি রানী কর
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ফয়সাল আহমদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: কামরুল হাসান
নিউজ ইনচার্জ : সুনির্মল সেন
অফিস : রংমহল টাওয়ার (৪র্থ তলা),
বন্দর বাজার, সিলেট।
মোবাইল : ০১৭১৬-৯৭০৬৯৮
E-mail: surmamail1@gmail.com
Copyright-2015
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি