সিলেটে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি কেন?

প্রকাশিত: ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৭

সিলেটে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি কেন?

Manual7 Ad Code

সিলেটে এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? অনেকেই হয়তো তা-ই বলবেন, কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রকোপ যখন অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন সেটা এড়িয়ে যাওয়ার আর সুযোগ থাকছে না। এই সমস্যার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরেদরে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ। এই সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং এই নিয়ন্ত্রণ আরোপে প্রকৃত সাংবাদিকদের সাহসী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মিডিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিভাবান তরুণরা এই সেক্টরে আসছেন না বলে অনেক সময় প্রায় অযোগ্য কিছু লোক দিয়ে কাজ চালানো শুরু হয়েছে।

Manual1 Ad Code

এদের কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেনি অধিকাংশ চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রশিক্ষণবিহীন, সাংবাদিকতা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানবিহীন অদক্ষরা সদ্য শিং-গজানো বাছুরের মতো বুকে আইডি কার্ড ঝুলিয়ে উন্মত্তের মতো আচরণ করছে। এরা রাস্তায় ট্রাফিক আইন ভাঙে, সরকারি বেসরকারি অফিসে গিয়ে ধমক দিয়ে কাজ করতে চায়। এর বাইরে আছে স্বঘোষিত ধান্দাবাজদের ‘সাংবাদিক’ হয়ে ওঠা। পাড়া মহল্লার সাময়িকী কী এক পাতার কিছু একটা ছাপিয়েই অথবা ২/৩ হাজার টাকা ব্যয় করে একটা অনলাইন পোর্টাল করে কিছু লোক স্বঘোষিত সাংবাদিক হয়ে পড়ছে। যেনতেন প্রকারে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা বিভিন্ন নামে অনলাইন পত্রিকা বের করে চলছে ব্ল্যাকমেইলিং আর চাঁদাবাজির উৎসব। এসব ‘সাংবাদিক’দের দায় নিতে হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদেরকে।

Manual4 Ad Code

‘পাঠক কি জানেন? সিলেট নগরীর ‘প্রাইভেট’ নাম দিয়ে জৈন্তাপুর, হরিপুর কানাইঘাট এলাকার শত শত সিএনজি-চালিত ধূষর অটোরিক্সাগুলো চলছে, এগুলোর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে এই ভূইফোঁড় অনলাইন পত্রিকার নাম ভাঙ্গিয়ে; আর এই অনলাইন পত্রিকার মালিকরা যে এর সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

জানা যায়, সাম্প্রতি কথিত এক সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তামাবিল বর্ডার এলাকায় বিজিবি’র কাছে গ্রেফতার হন এক ভূয়া সংবাদকর্মী। তার পরেও থেমে নেই অসাধু, অযোগ্য সাংবাদিকদের চাঁদাবাজি। কানাাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইঘাটের রেজিস্ট্রিশন বিহীন সিএনজি অটোরিক্সা টুকন বাণিজ্যের ব্যাপারে কয়েক সিএনজি চালক জানান, কথিত ওই সাংবাদিককে প্রতিমাসে বড় ধরনের চাঁদা দিতে হয় আমাদের। আমাদের ষ্ট্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি ষ্ট্যান্ড থেকে অবৈধভাবে চাঁদা উঠান তিনি। চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেন ওই কথিত সাংবাদিক।

Manual1 Ad Code

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোক্তভূগী কয়েক জন জানান, ওই সাংবাদিকের কথা না শুনলে আমাদেরকে প্রশাসনের ভয় দিখিয়ে বলেন, আমি প্রশাসনের অনেককে রদবদল করাতে পারি যে কোনো সময়। আমাদের পুলিশী হয়রানীতে ফেলে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই সাংবাদিক। আবার আমাদের বিভিন্ন কাজ করে দিবেন বলে নগদ টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে অনেক বার। যার প্রতিবাদ করতে গেলে আমাদের উপর নেমে আসে নির্যাতন। এ থেকে আমরা মুক্তি পাওয়ার আকূল আবেদন জানান তারা।

এখন কথা হচ্ছে এসব সামলাবে কে? এজন্য একটি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিধিমালা তৈরির পক্ষে সিলেট ‘রিপোর্টার্স ক্লাব।’ সব পেশারই লাইসেন্স প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান থাকে। আপনি এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব বই পড়ে ঝালাপালা হয়ে গেলেও চিকিৎসা শুরু করার আগে আপনাকে সনদ নিতে হবে। এই সনদ গ্রহণের মাধ্যমে আপনি ন্যূনতম নিয়মনীতি ও পেশাগত সততার প্রতি অঙ্গীকার করতে হয়। আপনি আইন পাশ করলেও সরাসরি বিচারকার্যে অংশ নিতে পারবেন না। এ জন্য আপনাকে তালিকাভুক্ত ও সনদধারী আইনজীবী হতে হবে। একাউন্টেন্ট হতে হলেও আপনাকে শুধু হিসাববিজ্ঞান জানলে চলবে না, সংশ্লিষ্ট পেশাগত প্রতিষ্ঠানের সনদ নিতে হবে। এসব সনদের কারণে একজন পেশাজীবী তার নিজের পেশার প্রতি সৎ থাকার অঙ্গীকার করেন। সনদ থাকার কারণে আমরা সাধারণ মানুষরা বুঝতে পারি যে, এই চিকিৎসক কী আইনজীবী আসলেই আমাকে সেবা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন কি না। সেবা প্রদানে গুরুতর কোনো অনৈতিকতা থাকলে আমরা বিচারপ্রার্থী হতে পারি এবং দায়ী ব্যক্তির সনদ বাতিল করে তাকে পেশা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। তাই এই ধরনের পেশাদারিত্বের নিবন্ধন ও সনদ একজন মানুষকে নিজ পেশায় দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করে।

সাংবাদিকতাও একটি স্পর্শকাতর পেশা। যে কারও হাতে যেভাবে ছুরিকাঁচি তুলে দিয়ে অপারেশনের সার্জন বানিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হয় না, একইভাবে যে কারও হাতে কলম-ক্যামেরা-বুম তুলে দিয়ে তাকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। আমি আশা করি সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বের সনদ দেওয়ার এখতিয়ার দিয়ে একটি কর্তৃপক্ষ তৈরির ব্যাপারে মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট সকল মহল গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন। এরকম প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা কীভাবে হবে, সনদ পাওয়ার জন্য কোনো প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য শর্তাবলী কী হবে?

এ ব্যাপারে দেশের অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীদের সহায়তায় একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া সম্ভব। এই কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে এবং তাদেরকে সেগুলো মেনে চলতে উৎসাহিত ও ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্যও করবে। অনেকেই হয়তো এই প্রস্তাব সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণের মনোভাব হিসেবে দেখতে চাইবেন। কিন্তু মনে হয় বরং প্রকৃত সাংবাদিকদেরই উচিত হবে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া। বর্তমানে নিজেদের পেশার সুনাম রক্ষার জন্যই সাংবাদিকতার বাগান থেকে আগাছা দূর করার ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code