এক বছরের ব্যবধানে হাকালুকিতে ২০ শতাংশ মাছ বৃদ্ধি

প্রকাশিত: ১:২৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৮

এক বছরের ব্যবধানে হাকালুকিতে ২০ শতাংশ মাছ বৃদ্ধি

Manual3 Ad Code

মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশের বৃহত্তর হাকালুকিতে ২০ শতাংশ মাছ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ছোট বড় মাছের পাশাপাশি এবছর বিপন্ন প্রজাতির অনেক মাছের আধিক্য দেখা যাচ্ছে হাওরে। কয়েকদফা বন্যা আসা যাওয়ার পর এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির পানি নেমেছে। আর পানি কমার সাথে সাথে স্থানীয়রা হাওরের মাঝে বিভিন্ন খালবিল, জলাশয় থেকে মাছ ধরা শুরু করেছেন। ধরা পড়ছে প্রচুর পরিমাণের দেশী প্রজাতির মাছ।

Manual2 Ad Code

মৎস্যবিভাগ বলছে দীর্ঘ বন্যায় মাছ স্বাভাবিক প্রজননের সুযোগ পেয়েছে বেশি আর সরকারি বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এবছর ২০ শতাংশ মাছ বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সরেজমিনে কুলাউড়া উপজেলার চকিয়া বিল ও নাগুয়া বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিলের পাড়ে অস্থায়ী নিলাম কেন্দ্রেস্থাপন করেছেন বিল ইজারাদাররা। সেখানে ভোর থেকে ব্যাবসায়িরা মাছ কেনার জন্য ভীড় করছেন অনেকে।ইজারাদারদের অধীনে জেলেরা সারাদিন বিলে জাল ফেলে মাছ ধরছেন। কিছুক্ষণ পর পর সেই মাছ নৌকায় করে ঘাটের নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও জেলেরা জানান, এবছর বড় বড় রুই, বোয়াল, আইড়, কমন কার্প, মৃগেল মাছের আধিক্য বেশি হলে অন্য জাতের দেশী মাছও ধরা পড়ছে। আর চাপিলা, টেংরা, মলা, চিংড়িসহ বিভিন্ন জাতের ছোট মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ছে। ছোট ও বড় মাছ আলাদা আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে ঘাটে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশে প্রায় ৪৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এসব মাছের অঞ্চলভেদে বিভিন্ন নাম রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে বাতাসি, কাজলি, বাইলা, মলা, ঢেলা, বাটা, পুঁটি, বাইম, রানী, পাবদা, টেংরা, পোয়া, মোয়া, কাকিলা, খলিসা, ছোট চিংড়ি, চান্দা, টাকি, চ্যাং, গুতুম, চ্যাপিলা, ভেদা, তারা, তিতপুঁটি, খোকসা, খরকুটি, দেশি জাতের শিং ও কৈ, দারকিনা, পটকা, কাশ খয়রা, টাটকিনি, গোলসা, রয়না, তেলা টাকি, তারাবাইন ও শালবাইন।

বিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে আছে চিতল, টিলা, খোকশা, অ্যালং, কাশ খাইরা, কালাবাটা, ভাঙন, কালি বাউশ, গনিয়া, ঢেলা, ভোল, পুতুল, গুইজ্যা আইড়, কানি পাবদা, মধু পাবদা, শিলং, চেকা, একঠোঁট্টা, কুমিরের খিল, বিশতারা, নেফতানি, নাপিত কই, ও গজাল।

Manual1 Ad Code

চরম বিপন্ন প্রজাতির মধ্যে আছে ভাঙন, বাটা, নান্দিনা, ঘোড়া মুইখ্যা, সরপুঁটি, মহাশোল, রিটা, ঘাউড়া, বাছা, পাঙ্গাশ, বাঘাইড়, চেনুয়া ও টিলাশোল।

সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে আছে ফলি, বামোশ, টাটকিনি, তিতপুঁটি, আইড়, গুলশা, কাজুলি, গাং মাগুর, কুচিয়া, নামাচান্দা, মেনি ও চ্যাং।

এবছর বিপন্ন প্রজাতির মাছ পাবদা, ফলি, চিতল, আইড়, কালবাউস ও গুলশা এবার বেশি দেখা যাচ্ছে (আগেও ছিলো তবে কম)। এছাড়া রাণী মাছ, কাকিলা, ছোট চিংড়ি, কাজলি, মলা, পুঁটি, টেংরা, পটকা, ভেদা, গনিয়া, কানি পাবদা, মধু পাবদার পরিমান বেড়েছে।

ব্যবসায়ী ইসরাব আলী, রফিক মিয়া, ফারুক আহমদ জানান, এজন্য বড় মাছ ধরা পড়ছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘাটে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে। এবছর দীর্ঘদিন বন্যা থাকায় মাছ বড়ও হয়েছে দ্রুত।

ফয়সাল মিয়া জানান, চকিয়ার বিলে বিশ থেকে ত্রিশ কেজি ওজনের মাছও ধরা পড়ছে। হাকালুকির মিঠাপানির তাজা ও সুস্বাদু মাছের সুনাম রয়েছে দেশে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও ভালো। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চেয়ে বাইরের ব্যাবসায়ীরা বেশি দামে মাছ কেনায় তারা লাভবান হচ্ছেন না।চকিয়া বিল ইজারার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জানান, এখানে অনেক জাতের মাছ ধরা পড়ে যা অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। তবে যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ার কথা সে পরিমাণ এখনো ধরা পড়ছেনা।

জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি হাওরের ৮০ ভাগ মৌলভীবাজারে ও ২০ ভাগ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত।মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে ৬০ ভাগ কুলাউড়ায় ১২ ও জুড়ি উপজেলায় ৮ ভাগ রয়েছে। প্রায় ১১২ প্রজাতির মাছের চারণক্ষেত্র হাকালুকি হাওরে ছোট বড় ২৩৮টি বিল রয়েছে। এরমধ্যে মৌলভীবাজার অংশে ২০০টি আর বাকি ৩৮টি সিলেট অংশে। এছাড়া মাছের ১৫টি অভয়াশ্রম আছে হাকালুকিতে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে হাওরের পানি কমলে ধরা পড়ে দেশী প্রজাতির মাছ। প্রতিদিন কোটি টাকার মাছ যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে।

কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেন, ’খুশির খবর হচ্ছে এবছর বিপন্ন প্রজাতির অনেক মাছ ফিরে এসেছে।কঠোরভাবে মৎস্য আইন প্রয়োগের ফলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে। আমরা প্রতিদিন ধরা পড়া মাছের আনুমানিক পরিমাণ যাচাই করে দেখেছি অন্য বছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি মাছ ধরা পড়ছে। বিশেষ করে বোয়াল ও আইড় মাছের পরিমাণ অনেক বেশি।’

Manual8 Ad Code

জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, প্রতি বছর ১৪ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয় হাকালুকিতে। এবছর বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিল নার্সারি স্থাপনসহ নানা উদ্যোগের ফলে উৎপাদন ২০ শতাংশ মাছ বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস আকন্দ জানান, গতবছর বন্যায় এ্যামোনিয়া গ্যাসে হাকালুকি হাওরে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা মায়। সেই ক্ষতি পোষাতে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় ৩০টি বিল নার্সারির (হাওর এলাকার বিল বা পুকুরে পোনা উৎপাদন) মাধ্যমে ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যায়ে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় ২৬ লাখ ৪০ হাজার পোনা উৎপাদন করে হাওরে ছাড়া হয়।

Manual2 Ad Code

এছাড়া আরো ২৮ লাখ টাকার পোনা মাছ অবমুক্ত করা হয়। তাছাড়া এবারের বন্যা ছিল দীর্ঘ সময়ের এতে পানি ছিল অন্য সময়ের চেয়ে বেশি তাই মাছ বারংবার প্রজননের সময় ও সুযোগ পেয়েছে।

হাকালুকি হাওর ছাড়াও জেলার কাউয়াদিঘী, হাইল হাওরসহ বিভিন্ন হাওরবিলে এই মৌসুমে মাছ ধরা হয়। জেলায় বছরে মাছের চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর জেলায় ৪৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code