দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

প্রকাশিত: ৬:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২৬

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

Manual5 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন বিএনপির এই প্রার্থী। তার প্রতিদ্বদ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

 

এ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি মির্জা ফখরুল।

 

আগামীকাল (শুক্রবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


যেভাবে ভোট
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

 

সাড়ে তিন দশকের মাথায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহস্পতিবার ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। সংসদ কক্ষে ভোট চলে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।

 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একানব্বইয়ের পর এবারই প্রথম একাধিক প্রার্থী ছিলেন। ফলে ভোট আয়োজন করতে হয় আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে।

 

এতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপি।

 

প্রার্থিতা বৈধ হওয়ার পরেই এটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, তেইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মহাসচিবই বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। কারণ দলীয় প্রার্থীর বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

 

এদিন দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে দুপুর ২টায় ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নির্দেশিকা তুলে ধরেন। এর পরপরই ভোটদান শুরু হয়।

 

Manual2 Ad Code

প্রথমে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।

 

তাদের পর বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে ভোট দেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। তার পরে ভোট দেন মির্জা ফখরুল।

 

বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ভোট দেন ২টা ১৯ মিনিটে। ব্যালট পেপার জমা দিতে রাখা হয় তিনটা বাক্স।

 

ভোটগ্রহণ শেষে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

 

ফল ঘোষণার পর সংসদে বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফখরুলকে একটি গোলাপ ফুল উপহার দিয়ে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

এ নির্বাচনের শুরুর আনুষ্ঠানিকতা সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন।

 

সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। আর সংরক্ষিত আসনে এমপি আছেন ৫০ জন।

Manual6 Ad Code

 

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে ৩৪৯ জন এমপি রয়েছেন, যারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। তবে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি।

 

তৃণমূল থেকে বঙ্গভবনে
বিএনপির তৃণমূল পর্যায় থেকে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে মির্জা ফখরুল উঠে আসেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে।

 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দমন-পীড়নের মধ্যে সংগ্রামে অবিচল এই নেতা ছিলেন দলের ময়দানের কান্ডারি। গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবার তিনি ‘মহামান্য’ হয়ে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে।

 

ছাত্রজীবনে বামপন্থায় আস্থা রাখা এই নেতা টানা দেড় দশক ধরে বিএনপির মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

শিক্ষকতা থেকে চার দশক আগে রাজনীতিতে আসা এই নেতার রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা। ‘সজ্জন রাজনীতিক’ হিসেবেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাম ধারার রাজনীতিতে নাম লেখান অর্থনীতির এই ছাত্র। তিনি ১৯৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন।

 

মির্জা ফখরুল সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে সে সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

 

অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষাকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন ১৯৭২ সালে। এরপর বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক পদে এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর পিএস পদে যোগ দেন।

 

এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে নেমে পড়েন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।

Manual8 Ad Code

 

বাবার পথ ধরে রাজনীতিতে
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা ছিলেন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।

 

বাবার মতো রাজনীতির পথ ধরলেও তিনি জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপে। সেখান থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ছেড়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যোগ দেন।

 

মির্জা ফখরুল ১৯৯০ সালে যোগদান করেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। তারপর ধাপে ধাপে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন।

 

২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবারের ভোটাভুটির আগ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

 

বিএনপির নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন।

 

রাজনীতির এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মোকাবিলা করেছেন এক-এগারোর পট পরিবর্তন পরবর্তী প্রতিকূলতা।

 

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়া বিএনপিকেও অসীম ধৈর্যে সংগ্রামে অটল রেখেছেন।

 

আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না।

 

দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন চলে যান, সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে মাঠ সামলেছেন মির্জা ফখরুল।

 

শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব। বহু মামলা লড়ার পাশাপাশি তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে।

 

দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সংকটে হাল ধরে থাকা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে কার্যত দলটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল।

 

সরকারে এলেন যেভাবে
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সরকারে কৃষি এবং বিমান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।

 

২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে সংসদে যাননি তিনি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটিই তার।

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন, বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊধর্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে গেছেন। দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তাদের সংসার।

 

(সুরমামেইল/এফএ)

Manual1 Ad Code


সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code