বাধ্যতামূলক অবসরে প্রভাবশালী ১৭ পুলিশ কর্মকর্তা

প্রকাশিত: ১২:২০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২৬

বাধ্যতামূলক অবসরে প্রভাবশালী ১৭ পুলিশ কর্মকর্তা

Manual6 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, বিরোধী দল দমনে আগ্রাসী ভূমিকা, জাতীয় নির্বাচনে ভোট কারসাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ১৭ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।

 

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের এই ১৭ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়।

 

Manual8 Ad Code

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অবসরে পাঠানো এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেবল রাজনৈতিক পক্ষপাত বা বিরোধী দলের ওপর নিপীড়নের অভিযোগই নয়, বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সরাসরি অসদাচরণ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার, পদক বাগিয়ে নেওয়া এবং ইয়াবা চালানের মতো চাঞ্চল্যকর অপরাধের তথ্যও উঠে এসেছে সরকারি নথিতে।

 

এর আগে বর্তমান সরকার ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে (১৪ জন ডিআইজি, ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ১ জন এসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। ৩ মে ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে এবং ২২ এপ্রিল একইভাবে ১১ জন ডিআইজি ও দুইজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

 

সরকারি সূত্র বলছে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তালিকা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতন, গুলি ও হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন পুলিশ কর্মকর্তাদেরও চাকরি থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তা চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন।

 

বেগম জিয়াকে হেনস্তা ও ৩ নারী কর্মকর্তা

অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, অবসরে পাঠানো তিন নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সরাসরি অসদাচরণ ও হেনস্থার অভিযোগ রয়েছে।

 

এর মধ্যে অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা ও জেসমিন বেগমের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে।

Manual7 Ad Code

 

এতদিন সিআইডিতে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা এবং নৌপুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি জেসমিন বেগমকে নিয়ে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে টেনেহিঁচড়ে উচ্ছেদ করেন।

 

জেসমিনকে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ও দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। আর রেবেকা সুলতানার বিষয়ে বলা হয়েছে, তার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে যাচ্ছে। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।

 

জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার হিসেবে কর্মরত ফরিদা ইয়াসমিনের বিষয়ে নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে মামলার রায় ঘোষণার পর তিনি নিজ দায়িত্বে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে গাড়িতে তুলে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় একই গাড়ির দ্বিতীয় সারির আসনে অবস্থান করেন। এ বিষয়ে তৎকালীন ডিএমপির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বাহবা পান এবং প্রশংসিত হন।

 

ডিএমপিতে কর্মরত থাকাকালে ফরিদা ইয়াসমিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপিসহ বিরোধী দল দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

 

আছেন- আড়িপাতা, নির্বাচনে কারসাজি ও দুর্নীতিতে জড়িতরাও

অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিক সুবিধা ও পছন্দের পদায়ন পেতে অনেক কর্মকর্তা গুরুতর অপরাধে জড়িয়েছেন। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন একাধিক সদস্য রয়েছেন।

 

তথ্যমতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা এবং হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহিল বাকী পুলিশ সদর দপ্তরের গোপন শাখায় দায়িত্ব পালনকালে ফোনে আড়িপেতে বিরোধী দলের নেতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচির তথ্য পাচার করতেন।

 

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি বিধান ত্রিপুরা (তৎকালীন মানিকগঞ্জের এসপি) বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং নির্বাচনে জালিয়াতিতে সহায়তা করে পুরস্কার হিসেবে পুলিশ পদক পান।

 

Manual3 Ad Code

অন্যদিকে অতিরিক্ত ডিআইজি সোহেলী ফেরদৌস ২০১৮ সালের রাতে ভোট কারসাজির সময় পুলিশ সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া এআইজি (মিডিয়া) থাকাকালে ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

পুলিশ স্টাফ কলেজের অতিরিক্ত ডিআইজি ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন কক্সবাজারের এসপি থাকাকালে সরাসরি ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েন এবং নিজের সরকারি গাড়িতে ইয়াবার চালান সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

 

এছাড়া সারদা পুলিশ একাডেমির (বিপিএ) ডিআইজি মো. ওয়ালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ এবং টিডিএস ঢাকার এসপি আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার তথ্য নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

 

আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ভোল পাল্টেছেন কেউ কেউ

Manual5 Ad Code

পদোন্নতি ও সুবিধা পেতে রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণও রয়েছে অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের তালিকায়। জানা গেছে, সিআইডির ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি পেতে নিজেকে ছাত্রলীগের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন।

 

অবসরে পাঠানো অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি ফয়সল মাহমুদ এবং এসপি আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরীকে ২০০২ সালে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেলে তারা চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

 

এছাড়া অতিরিক্ত ডিআইজি হাসিনা রহমান, কানিজ ফাতেমা এবং সুলতানা নাজমা হোসেন পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে বিগত সরকারের আমলে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, পদক এবং সরকারি খরচে একের পর এক বিদেশ সফরের সুযোগ পান।

 

এক নজরে অবসরে পাঠানো ১৭ কর্মকর্তা

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ১৭ জন কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন ৩ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ১ জন পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ১ জন উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি)।

 

তারা হলেন হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহিল বাকী, সারদা পুলিশ একাডেমির (বিপিএ) ডিআইজি মো. ওয়ালিদ হোসেন এবং সিআইডির ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান।

 

অতিরিক্ত ডিআইজিদের মধ্যে রয়েছেন সিআইডির মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন ও রেবেকা সুলতানা, ট্যুরিস্ট পুলিশের বিধান ত্রিপুরা ও সুলতানা নাজমা হোসেন, পুলিশ স্টাফ কলেজের ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন, এপিবিএনের সোহেলী ফেরদৌস, সারদা পুলিশ একাডেমির মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, পুলিশ টেলিকমের হাসিনা রহমান, পুলিশ অধিদপ্তরের ফয়সল মাহমুদ ও কানিজ ফাতেমা, নৌপুলিশের জেসমিন বেগম এবং ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন।

 

এছাড়া রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান এবং টিডিএস ঢাকার পুলিশ সুপার আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরীকেও একই আদেশে অবসরে পাঠানো হয়েছে।

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code