সীমান্তের ওপারে মৃত্যুফাঁদ, এপারে চোরাচালানিদের দৌরাত্ম্য! জবাবদিহি করবে কে?

প্রকাশিত: ৮:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

সীমান্তের ওপারে মৃত্যুফাঁদ, এপারে চোরাচালানিদের দৌরাত্ম্য! জবাবদিহি করবে কে?

Manual6 Ad Code

 

হাবিব সরোয়ার আজাদ:
দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকা, টেলিভিশনের প্রতিবেদন এবং তাহিরপুর থানার অপমৃত্যু মামলা-সংক্রান্ত ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের লাকমা, লালঘাট, চারাগাঁও ও কলাগাঁও সীমান্তের ওপারে অবৈধভাবে কয়লা আনতে গিয়ে কোয়ারি ধসে কয়লা, মাটি ও পাথরের চাপায় ইউনুছ আলীসহ ১৮ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

 

একটি-দুটি নয়-একের পর এক মৃত্যু। প্রশ্ন হলো, এসব মৃত্যু কি শুধু অপমৃত্যুর মামলা, লাশ উদ্ধার ও ময়নাতদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

 

লাকমা গ্রামের লোকমান মিয়া ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি মেঘালয়ের গহীনে কয়লা আনতে গিয়ে কোয়ারি ধসে মারা যান। লাকমা পশ্চিমপাড়ার রজব আলী একই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি মেঘালয়ের একটি কয়লা কোয়ারিতে কাজ করতে গিয়ে নিহত হন।

 

ওই এলাকার নুর মিয়া ২০২৫ সালের ৫ মে কোয়ারি ধসে প্রাণ হারান। এ ঘটনায় তাঁর ছেলে শাহিন ইসলাম আহত হন। একই এলাকার মজিবুর রহমান ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল মেঘালয়ের একটি কয়লা কোয়ারি ধসে মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর কিশোর ছেলেও আহত হয়।

Manual4 Ad Code

 

প্রশ্ন হলো- কার প্ররোচনায় শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পেরোয়? কারা তাদের পাঠায়, ওপারে কয়লা উত্তোলনের ব্যবস্থা করে এবং এপারে সেই কয়লা গ্রহণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি করে? এই অবৈধ বাণিজ্যের মূল সুবিধাভোগী কারা?

 

সুনামগঞ্জ সীমান্তে সিলেট সেক্টরের অধীন সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কয়লা ও চুনাপাথর চোরাচালানপ্রবণ এলাকায় লাউরগড়, চানপুর, ট্যাকেরঘাট, বালিয়াঘাট, চারাগাঁও ও বিরেন্দ্রনগরসহ ছয়টি বিওপি রয়েছে। অভিযান, পণ্য জব্দ ও মামলা চলছে। দায়িত্ব পালনে বিজিবি সদস্যরা বাধা বা হামলার মুখেও পড়েছেন।

 

Manual2 Ad Code

অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী নদীপথ ও সড়কপথে অবৈধ কয়লা পরিবহনও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নৌ পুলিশকে তাদের দায়িত্বাধীন নৌপথে চোরাচালান, অবৈধ পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট নৌযানের গতিবিধি নজরদারিতে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

 

তাহলে প্রশ্ন—এত অভিযান, জব্দ ও মামলা সত্ত্বেও চোরাচালানের মূল প্রবাহ বন্ধ হচ্ছে না কেন?

Manual3 Ad Code

 

শুধু শ্রমিক বা বাহক আটক করে এই সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে না। বাহকের পেছনের হোতাদের শনাক্ত করতে হবে। সীমান্তপথ নিয়ন্ত্রণ, কয়লা সংগ্রহ-পরিবহন ও অর্থ লেনদেনের পুরো নেটওয়ার্ক তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

 

কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে শুধু ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে ফাইল বন্ধ করা যাবে না। মৃত্যুর সঙ্গে চোরাচালানের যোগসূত্র থাকলে সংশ্লিষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

এ কাজ কোনো একক সংস্থার নয়। পুলিশ, বিজিবি, নৌ পুলিশ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, কাস্টমস এবং জাতীয় নিরাপত্তা (গোয়েন্দা) সংস্থাকে সমন্বিতভাবে চোরাচালান নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দিতে হবে।

 

তাহিরপুরের বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী স্থল শুল্ক স্টেশনকেন্দ্রিক কিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে- অল্প স্বার্থে চোরাচালানের কয়লাকে বৈধ দেখাতে নতুন-পুরোনো এলসির ফটোকপি সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে।

 

চোরাচালানের কয়লা পরিবহনে ব্যবহৃত নৌকা, ট্রলার ও বাল্কহেডের ক্ষেত্রে আমদানিকারক সমিতি থেকে চালানপত্র সরবরাহের বিষয়টিও বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, সমিতি নিয়োজিত সেন্ট্রি বা প্রহরীদের মাধ্যমে চোরাচালানের নৌযান নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করে প্রতিরোধ করতে হবে।

 

১৮টি প্রাণ চলে গেছে। এরপরও যদি একই পথে শ্রমিক যায়, মৃত্যু ঘটে এবং চোরাচালানের কয়লা আসে- তাহলে শুধু অভিযান দিয়ে দায়িত্ব পালনের দাবি কতটা অর্থবহ, সেই প্রশ্ন উঠবেই।

 

আর কত মৃত্যু হলে সীমান্তের এই মৃত্যুফাঁদ ও কয়লা চোরাচালানের মূল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

 

লক্ষ্য শুধু কয়লা জব্দ নয়- লক্ষ্য হতে হবে মূল হোতাদের শনাক্ত করে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।

 

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী, মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সংগঠক।

Manual6 Ad Code

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code