স্যানিটেশন সুবিধা বঞ্চিত : দূষিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গুয়ার হাওড়

প্রকাশিত: ৪:৪২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৬

স্যানিটেশন সুবিধা বঞ্চিত : দূষিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গুয়ার হাওড়

Manual2 Ad Code

tanguar-hawar-sanitation-news-pic-jpeg

Manual5 Ad Code

ফয়ছল আহমদ :: দেশে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে শতভাগ স্যানিটেশন সুবিধা পাইয়ে দেয়ার কথা বলা হলেও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ের প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিকই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সুনামগঞ্জে জেলার তাহিরপুর উপজেলায় অধিকাংশ নাগরিক বাঁশ ও ছালার বেড়া দিয়ে তৈরি শৌচাগার ব্যবহার করছে। এসব খোলা শৌচাগারের মলমূত্র আবার মিশে যাচ্ছে ওই হাওড়ের পানিতে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওড়পাড়ের নাগরিকরা।

Manual7 Ad Code

সরকারী এক তথ্যে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩০৯টি পরিবার রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ২ লাখ পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার করে না বলে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, স্যানিটেশনের সুবিধাপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই শহরের বাসিন্দা। তবে হাওড়-তীরবর্তী স্থানে বসবাসরত পরিবারগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশই স্যানিটেশনের আওতার বাইরে।

মূলত বছরের প্রায় আট মাস পুরো এলাকা পানির নিচে থাকায় ওই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষকে এখনো স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে দাবি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্যানিটশন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর। এছাড়া হাওড় অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ হতদরিদ্র হওয়ায় অধিক টাকা ব্যয় করে উন্নত শৌচাগার নির্মাণের সক্ষমতাও তাদের নেই। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসনের নেয়া বোমা মেশিনের ড্রাম দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাসমান শৌচাগার নির্মাণের পাইলট প্রকল্প সফলতা পেয়েছে।

Manual5 Ad Code

সুত্র মতে, ২০১০ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষকে স্যানিটেশনের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ২০১০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এর পর ২০১৫ সালে ৯৯ শতাংশ মানুষকে স্যানিটেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আইডিয়ার নির্বাহী পরিচালক নজমুল হক বলেন, সরকারি হিসাবে ৯৯ শতাংশ জনগণকে স্যানিটেশনের আওতায় আনা হয়েছে বলা হলেও উন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণ করে মাত্র ৬১ শতাংশ মানুষ। তিনি বলেন, হাওড় অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই স্যানিটেশন সুবিধাবঞ্চিত। হাওড়ে স্যানিটেশন নিয়ে অনেক কাজ করা হলেও সমন্বয়হীনতার অভাবে কাংখিত সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না।

Manual1 Ad Code

সুনামগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেম জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল হাওড়াঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে কিছু অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রকল্পের সফলতা আসছে না। সম্প্রতি স্কুলে স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ৪০৭টি স্যানিটারি ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, হাওড় অঞ্চল স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। এ থেকে উত্তরণে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে।

ভাসমান শৌচাগার: বছরের আট মাস পানির নিচে থাকায় হাওড় অঞ্চলে প্রথাগত স্যানিটেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে সফলতা পাওয়া কঠিন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিকল্প শৌচাগার ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তালুত। তিনি হাওড়বাসীর জন্য নির্মাণ করেন ভাসমান শৌচাগার। প্রাথমিক পর্যায়ে ফতেহপুর ইউনিয়নের ১০০টি পরিবারের মধ্যে ৪৮টি ভাসমান শৌচাগার বিনামূল্যে প্রদান করেছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসন। মোহাম্মদ তালুত বর্তমানে উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে আছেন। দেশছাড়ার আগে তিনি বলেন, ‘যোগদানের পর প্রথম যে বিষয়টি খেয়াল করি তা হচ্ছে, এলাকার মানুষজন আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও নানা সমস্যায় জর্জরিত। তাদের অন্যতম সমস্যা হিসেবে স্যানিটেশনকে চিহ্নিত করি।’ তিনি বলেন, ওই সময় অবৈধ বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে পাম্প ও তেলের খালি ড্রামসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র জব্দ করা হতো। সাধারণত এসব জিনিস নষ্ট করা হয় বা নিলামে বিক্রি করা হয়, কিন্তু আমি ড্রামগুলো দিয়ে ভাসমান শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করি। কারণ ড্রামগুলো খুবই মজবুত ও জলে ভেসে থেকেও পাঁচ-ছয় বছরে নষ্ট হয় না। ভাসমান শৌচাগার নির্মাণে তিন বা পাঁচটি ড্রাম ব্যবহার করা হয়। ড্রামের ভেতরে বর্জ্য জমে ভরাট হয়ে গেলে তা পরিষ্কারেও রয়েছে উদ্ভাবনী উপায়। প্রতিটি শৌচাগারই ভাসমান থাকায় তা পানির মধ্য দিয়ে ভাসিয়ে আনা যায় গ্রামের একটি নির্দিষ্ট অংশে, যেখানে পাম্পের সাহায্যে সব বর্জ্য নিয়ে জমা করা হয় স্থায়ী একটি সেফটি ট্যাংকে। মোহাম্মদ তালুত বলেন, এসব শৌচাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সব কয়টি উপকরণই উদ্ধার করা হয়েছে বোমা মেশিনবিরোধী অভিযান থেকে। ফলে প্রতিটি শৌচাগার নির্মাণে মাত্র কয়েকশ টাকা করে ব্যয় হয়েছে। ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মকবুল বলেন, ভাসমান শৌচাগার স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় হাওড়বাসীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে গ্রামের শতভাগ বাসিন্দাকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার বলে মনে করেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code