আব্দুস সামাদ আজাদ : প্রথম দেখা, প্রথম শেখা

প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২১

আব্দুস সামাদ আজাদ : প্রথম দেখা, প্রথম শেখা

Manual8 Ad Code

আল-আজাদ : তখন শুকনো মৌসুম। গরমকাল। বয়স আর কত হবে। না, সঠিক বলা সম্ভব নয়। তবে শিশুকাল। খেলাধুলা শেষে একদিন সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে দেখি, আমাদের ঘরের ভেতর দরজার কাছে চেয়ারে বসা এক মোটাসোটা লোক। পরনে কালো বা এর কাছাকাছি কোনো রঙের প্যান্ট। গায়ে সাদা হাফ শার্ট। নিজ হাতে পাখা ঘুরিয়ে বাতাস করছেন। দেখেই বুঝে নিলাম, বড় কোনো অতিথি নিশ্চয়ই। কারণ তখনকার দিনে গ্রামে প্যান্ট-শার্ট পরা লোক সাধারণত দেখা যেত না।

 

আমার নানাবাড়ির খুব নামডাক। সেখানেই আমার জন্ম এবং কৈশোর পর্যন্ত বেড়ে ওঠা। বড়নানা (মায়ের বড়চাচা) আব্দুল হক ছিলেন জগদল ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান। এ কারণে তৎকালীন মহকুমা সদর সুনামগঞ্জ কিংবা থানা সদর দিরাই থেকে সরকারি ছোট-বড় প্যান্ট-শার্ট পরা কর্মকর্তারা প্রায়ই আসতেন। আসতেন পুলিশের কর্মকর্তারা। তাই প্যান্ট-শার্ট আমার কাছে নতুন কিছু না হলেও এই মানুষটিকে দেখে কেন জানি ভিন্নরকম অনুভূতি হলো।

 

একটু পরেই আমার মা মনোয়ারা বেগম রান্নাঘর থেকে নানা জাতের একথালা পিঠা নিয়ে হাজির হলেন অতিথির সামনে। আমার চোখে তখনো বিস্ময়। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছি। আম্মা কোনো কথা না বলে পিঠার থালাটি তার হাতে তুলে দিলেন। এরপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমার নানা ছমেদ মিয়া। ঢাকাত থাকইন।’

 

চমকে উঠলাম নামটি শুনে। পরিচিত নাম। বড়দের কাছে বহুবার শুনেছি। আরও শুনেছি, তিনি সবসময় লুকিয়ে থাকেন। কারণ পুলিশ তাকে পেলে নাকি ধরে জেলে পাঠিয়ে দেবে। তখন ‘হুলিয়া’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় ছিল না।

Manual1 Ad Code

 

ভুরাখালির আব্দুস সামাদ (তখন পর্যন্ত আজাদ শব্দটি তার নামের সাথে যুক্ত হয়নি) আমার সম্পর্কে নানা। মায়ের চাচা। অন্যদিকে আমার অকাল প্রয়াত একমাত্র খালা আনোয়ারা বেগমের চাচাশ্বশুর। এই তাকে প্রথম দেখা। তাও মাত্র কিছুটা সময়। এরপর দীর্ঘবিরতি। ১৯৭০ সালে এসে আবার তার দেখা পেলাম। ততদিনে কতটি বছর পার হয়ে গেছে সে হিসেব কোনোদিন পাব না।

Manual4 Ad Code

 

এই দেখার সুবাদে তিনি খুব কাছে টেনে নিলেন আমাকে। সুযোগ পেলাম তার মতো একজন জাতীয় নেতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের। তাকে বহুদিন খুব কাছাকাছি থেকে দেখেছি। এ কারণে স্মৃতির ভাণ্ডার বেশ বড়, কিন্তু সব স্মৃতি তো আর একবারে রোমন্থন করা যাবে না। তাই একটি ঘটনা তুলে ধরছি।

 

আমাদের পরিবার তখন দিরাই থানা সদরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। সময়টা ১৯৭০ সাল। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশ উত্তাল। নির্বাচনী প্রচারে মুখর। দিনরাত সভা-সমাবেশ-মিছিল চলছে। অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন বলে পরিচিত দিরাই-শাল্লায় তখন কী অবস্থা থাকতে পারে তা রাজনীতি সচেতন যে কেউ অনুমান করে নিতে পারেন।

 

বাঙালি জাতির ভাগ্য নির্ধারণী ওই ঐতিহাসিক নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সিলেট-১০ আসন ছিল তখনকার দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা ও জামালগঞ্জ থানা নিয়ে। প্রার্থী ছিলেন মূলত: তিনজন। আওয়ামী লীগের আব্দুস সামাদ আজাদ, ন্যাপের গুলজার আহমদ ও পিডিপির অ্যাডভোকেট গোলাম জিলানী চৌধুরী। প্রাদেশিক পরিষদের আসনটির নম্বর ছিল সিলেট-২। এলাকা গঠিত ছিল দিরাই ও শাল্লা থানা নিয়ে। প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগের অক্ষয় কুমার দাস, ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও পিডিপির আব্দুল খালিক। আরও দুয়েকজন প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তাদের তেমন পরিচিতি ছিল না। কারও অবস্থানও ছিল না হিসেবের মধ্যে। তাই হয়তো এত দ্রুত স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছেন।

 

আমি তখন কিশোর। সিলেট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকি মিরের ময়দান এলাকায় মামা মাস্টার আব্দুল খালিকের বাসায়, কিন্তু নির্বাচনের আগে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে চলে যাই।

 

দিরাইতে এই বয়সের আমরা কয়েকজন ছিলাম বুঝে না বুঝে ‘নৌকা’র ঘোর সমর্থক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দারুণ ভক্ত। আব্দুস সামাদ আজাদের কিশোর কর্মী। প্রতিদিন নির্বাচনী মিছিলে যাওয়া চাই। বিকেলটা আমাদের কাটত দিরাই বাজারে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যালয়ে। সেখানে যাবার আরও একটা কারণ ছিল। আর তা হলো চারণশিল্পী আব্দুল মান্নানের দরাজ গলার গান। একটানা মাইকে বাজতো এসব গান। বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস, ছয় দফা-এগারো দফা, বঙ্গবন্ধু, আব্দুস সামাদ আজাদ, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক, নির্বাচন, নৌকা ইত্যাদিকে উপজীব্য করে সহজ-সরল ভাষার এসব গান ছিল তার নিজের লেখা। টেপ রেকর্ডার দিয়ে বাজানো হতো। কখনও কখনও তিনি নিজে গাইতেন। এই গানগুলো সাধারণ মানুষের মনকে দারুণভাবে নাড়া দিত।

 

Manual6 Ad Code

অত্যন্ত দরদী কণ্ঠের অধিকারী আব্দুল মান্নান সারাক্ষণ আব্দুস সামাদ আজাদের সঙ্গে থাকতেন। প্রতিটি সভা-সমাবেশে এসব গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করতেন জনগণকে। মাঝে মধ্যে নির্বাচনী কার্যালয়ে ফিরলে সবাই তাকে গান গাইতে চেপে ধরতেন।

 

আব্দুস সামাদ আজাদের সেই কিশোর কর্মীবাহিনীতে ছিলাম মূলত: আমরা চারজন। এর মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সৈয়দ হাম্মাদুল করিম (আলিকোর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা) ও আমার ছোটভাই সুজাত মনসুর (সাবেক ছাত্রনেতা) ছিল ভালো বক্তা। আমার অপর বন্ধু মারুফ চৌধুরী ছিল বৈঠকি কথাবার্তায় দারুণ পটু। আমার ছিল ছবি আঁকার নেশা। হাতের লেখাও ছিল ভাল। তাই আমাকে দেওয়া হয় পোস্টার লেখার দায়িত্ব। আমিও সানন্দে তা গ্রহণ করি।

 

একপর্যায়ে আমাদের বাসার একটি কক্ষে আমরা রীতিমতো আওয়ামী লীগের একটি নির্বাচনী কার্যালয় খুলে বসি। প্রতিদিন বিকেলবেলা বসতাম গিয়ে সেই নির্বাচনী কার্যালয়ে। আমি বসতাম পোস্টার লিখতে। অন্যদিকে চলত বক্তৃতার পর বক্তৃতা, যেন সত্যি সত্যিই কোনো জনসভায় দাঁড়িয়ে কেউ বক্তব্য রাখছে। এই ফাঁকে পোস্টার লেখা শেষ হয়ে যেত। তখন সবাই মিলে তা বড় রাস্তায় লাগাতে যেতাম।

 

নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে কয়েকদিনের বিরতির পর একদিন বিকেলবেলা হঠাৎ করে আব্দুস সামাদ আজাদ আমাদের বাসায় উপস্থিত। সঙ্গে দুয়েকজন নেতা-কর্মী। তিনি সোজা চলে গেলেন রান্নাঘরে। আম্মা ছিলেন সেখানে। রান্নাঘরে ঢুকেই বাঁশের বেড়ায় ঝুলানো একটি আধি (ছোট আকারের পাটি) নিজের হাতে খুলে নিয়ে মেঝেতে বিছালেন। ধপাস করে বসে পড়লেন সেটার উপর। সারা শরীরে তার ক্লান্তির ছাপ। রোগা রোগা লাগছে। সম্ভবত বেশ ক্ষুধার্ত ছিলেন। তাই আম্মাকে তাগিদ দিয়ে বললেন, ‘যা আছে দাও তো।’ আম্মা তাড়াহুড়ো করে তাকে খেতে দিলেন। তিনিও গোগ্রাসে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া খাবার খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ালেন। চলে যাবেন। সাহস করে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী খবর?’ বললাম, ‘আমাদের অফিস দেখে যান’। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিসের অফিস?’ জানালাম, ‘আওয়ামী লীগের’। ‘তাই না কি? তাহলে চলো দেখি, কেমন অফিস বানিয়েছো।’- বলেই সামনের দিকে পা বাড়ালেন। এই ফাঁকে আম্মা অনুরোধ জানালেন, ‘চাচাজী, সময় পাইলেওই খাইতে আইবা।’ আবারও হাসি। এবারের হাসিতে বুঝি বোঝাতে চাইলেন, ‘মা রে, ইচ্ছে করলেই আসতে পারব না। সামনে কঠিন পরীক্ষা। এতে জিততে না পারলে সবাই আমরা শেষ হয়ে যাব। আগে জয়ী হই, তারপর এসে পেট ভরে খাবো।’

 

আমাদের নির্বাচনী কার্যালয়ে ঢুকে বেশ কিছু সময় ধরে দেয়ালজুড়ে লাগানো পোস্টারগুলো দেখলেন, পড়লেন, হাসলেন। আদর করলেন তার কিশোর সেনাদের। এরপর বাইরে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘তোমার আমার ঠিকানা…’ বলেই থেমে গেলেন। আমরা বুঝলাম, তিনি এর পরের অংশ আমাদের নিকট থেকে জানতে চাইছেন। কে একজন বলে উঠলো, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। আব্দুস সামাদ আজাদ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই স্লোগান লেখা পোস্টার কিন্তু তোমাদের অফিসে নেই।’ বেশ লজ্জা লাগলো, কিন্তু তিনি আর কিছু বললেন না।

 

নেতা চলে যাওয়ার পরপরই রঙ-তুলি নিয়ে বসে পড়লাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই পোস্টার লেখা হয়ে গেল, ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’। শুধু পোস্টারই লেখা হলো না, সেই সাথে স্লোগানটিও শেখা হয়ে গেল। হয়ে গেল মুখস্থ, কিন্তু স্লোগানটি যে কত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তখনকার সময়ের জন্য তা বুঝতে অনেকদিন লেগেছিল।

Manual6 Ad Code

 

এই একটি ছোট্ট ঘটনাই জানান দেয়, আব্দুস সামাদ আজাদ কত বড় মাপের এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ‘জয়বাংলা’র পর ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’র মতো স্লোগানগুলোকে প্রতিটি বাঙালির ঠোঁটে তুলে দিতে হবে, যাতে তারা তাদের প্রকৃত ঠিকানা খুব সহজেই চিনে নিতে পারে।

 

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সভাপতি, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code