হাওর পাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা

প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০১৭

হাওর পাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা

Manual1 Ad Code

শুভেন্দু শেখর দাস, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :: সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন নাজুক হয়ে পড়েছে। গেল পিএসসি’র প্রাথমিক শিক্ষায় পাশের হার জেলার সব চেয়ে নীচে নেমে এসছে জামালগঞ্জের শিক্ষা ব্যবস্থা। এ জন্য অভিভাবকরা অধিকাংশ শিক্ষকদের অবহেলা ও সঠিক মতো স্কুল না করাকে দায়ী করেছেন। বেশীর ভাগ স্কুলেই সময়মতো ক্লাশ না নিয়েই ছুটি দিচ্ছেন শিক্ষকরা। এই অবস্থা উপজেলার প্রায় বেশীর ভাগ স্কুলেই।

অভিযোগ ওঠেছে কিছু স্কুল শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা গণ ও অফিস ম্যানেজ করে রীতিমতো স্কুল ফাঁকি দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেক শিক্ষকই মাসের পর মাস স্কুল চলাকালে দল বেঁধে উপজেলা সদরে শিক্ষা অফিস সংলগ্ন বিভিন্ন চায়ের ষ্টলে আড্ডা দিতে দেখা যাচ্ছে।

এমন অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের কাছে জানতে চাইলে, উত্তর একটাই স্কুলের কাজে সদরে এসেছেন। সম্প্রতি খুঁজারগাঁও স্কুলের প্রধান শিক্ষক শংকর সমাজপতির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলেও লোক দেখানো তদন্ত করে অভিযোগের সমাপ্তি হয়ে যায়।

হাওরের বেশ কয়েকটি স্কুল পরিদর্শনে গেলে ছাত্র-ছাত্রীরা জানায়, স্যার আইন শুক্রবারে, আইয়া খালি খাতাত কিতা লেখইন, হারা দিন থাইক্কা বিকালে আবার যাইনগ্যা, মাঝে মাঝে হেড স্যার আইন, আবার দুই তিন দিন পর পর আইন, মেডাম আর দিদি মনি ডেলি আইন। আমরার বেশীর ভাগই একটা-দুইডা কইরা ক্লাস অয়, আইজকাও একটা ক্লাস অইছে, এভাবেই মনের কথা গুলো বলছিলো স্কুলের শিক্ষার্থীরা। দুপুর অইলেই ডেলি আমরার ইস্কুল ছুটি অইযায়, আমরা গিয়া খেলি, ম্যাডাম আর স্যাররাও যাইনগ্যা বলে কথা গুলো জানাচ্ছিলো স্কুলের শিক্ষার্থীরা।

Manual3 Ad Code

জামালগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ প্রধান শিক্ষকরাই স্কুল কামাই করেন। অজুহাতে হিসেবে নিয়মিত উপজেলা সদরে দাফতরিক কাজকে অজুহাত দিয়েই চালিয়ে দেন বলে অভিযোগের শেষ নেই। উপজেলা শিক্ষা অফিস, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বা দায়িত্বশীলদেরকে এভাবেই ম্যানেজ করে চলছেন দিনের পর দিন।

জামালগঞ্জের এমনও প্রধান শিক্ষক আছেন যারা দীর্ঘদিন হলেও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। আবার কোন কোন শিক্ষক সপ্তাহে একদিন বিদ্যালয়ে গিয়ে পুরো সপ্তাহের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে আসেন বলে জানিয়েছে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা।

Manual1 Ad Code

এমনও ঘটনা আছে প্রধান শিক্ষক বদলী শিক্ষক রেখে বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন। অবশ্য উপজেলা শিক্ষা বিভাগও এমনটিই স্বীকার করেছেন যে, কিছু শিক্ষককের কারনে পুরো উপজেলা শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্নামের শিকার হচ্ছে। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা একজন শিক্ষক উপবৃত্তির কারনে অফিসে আসার কথা বললেও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ৩ জন শিক্ষকই বদলীর বিষয়ে উপজেলা সদরে এসেছিলেন বলে জানান। কার কথা ঠিক এ নিয়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা।

সোমবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের খুঁজারগাও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ৪জন শিক্ষকের ৩ জন সহকারী শিক্ষক পাঠদান করছেন, ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শংকর সমাজপতি সকালেই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে উপজেলা সদরে চলে এসেছেন। অবশ্য শংকর সমাজপতির উপর অন্তহীন অভিযোগ থাকলেও তার কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা বলে জানান স্থানীয় বেশ কিছু লোক।

একই ভাবে মাতারগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরে গিয়ে দেখা যায় ৪ জন শিক্ষকের ৩ জন সহকারী শিক্ষক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেনী কক্ষে পাঠদান করছেন। প্রধান শিক্ষক গোলাম সারোয়ার বিদ্যালয়ে উপস্থিত নেই। দুপুর ১ টার দিকে পূর্ব রাজাবাজ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ জন শিক্ষককের দুজন কষ্ট করে ৩ টি শ্রেনী কক্ষেই পালাক্রমে ক্লাস নিচ্ছেন, আর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অফিসের কাজের নাম করে উপজেলা সদরেই গেছেন।

Manual6 Ad Code

ইনাত নগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুর পৌনে একটায় দেখা যায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নেই। বিদ্যালয়ের পরিবেশও একে বাড়ে নাজুক, অপরিস্কার, নোংরা, ময়লা আর্বজনায় ভর্তি।

জানা যায়, বছর খানেক পূর্বে ওই বিদ্যালয়ে স্লীপের ৬০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছিলো গ্রীল করার জন্য। গ্রীল না করেই শিক্ষা অফিস ম্যনেজ করে টাকা আত্মসাদ করেছে বলে ইনাত নগর গ্রামের বেশ কয়েক জন জানান।

তবে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমিনুর রশিদ বলেন, টাকা জমা আছে কাজ করা হবে পড়ে। শুধু এই বিদ্যালয় গুলো নয় উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরাই এমন কার্যক্রম করছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। প্রধান শিক্ষকদের এমন কর্মকান্ডে উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে।

এ বিষয়ে খুজারগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর সমাজপতি বলেন, আমি উপবৃত্তির কাজে উপজেলা সদরে এসেছিলাম। মাতারগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম সারোয়ার বলেন, আমি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলাম, দুপুরে দাপ্তরিক কাজে উপজেলা সদরে এসেছিলাম।

পূর্ব রাজাবাজ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধা রঞ্জন তালুকদার বলেন, আমি বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির কাজে উপজেলা সদরে গিয়েছিলাম।

এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, খুজারগাঁও ও মাতারগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে নেই সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, কেন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে।

Manual6 Ad Code

জামালগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নূরুল আলম ভুঁইয়া বলেন, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ৩ জন প্রধান শিক্ষকই বদলী জনিত কারনে উপজেলা সদরে এসেছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code