হাত-পা ছাড়া সন্তান ও পা হারানো অদম্য বাবার গল্প

প্রকাশিত: ৩:২৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২১

হাত-পা ছাড়া সন্তান ও পা হারানো অদম্য বাবার গল্প

Manual8 Ad Code

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাবা মুঞ্জির আল-নাজ্জালের সাথে ছেলে মুস্তাফা। ছবি : সংগৃহীত


অনলাইন ডেস্ক : বাবার কোলে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এক শিশু। অনাবিল হাসি তার মুখে। বাবার মুখেও তৃপ্তির হাসি। তবে পা নেই বাবার আর হাত-পা নেই সন্তানের। এমনই এক গল্প ক্যামেরার ক্লিকে সারাবিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন তুরস্কের আলোকচিত্রী মেহমেত আসলান। তার সেই ছবিটি এ বছর হাজার হাজার ছবিকে পেছনে ফেলে সিয়েনা আন্তর্জাতিক ফটো অ্যাওয়ার্ডসের ২০২১- এ সেরা ছবির পুরষ্কার পেয়েছে।

Manual4 Ad Code

 

বাবা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিক মুঞ্জির আল-নাজ্জাল। তিনি বোমা বিস্ফোরণে পা হারান। তারপর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তুরস্ক সীমান্তের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে। লড়াই করছেন নিজের জীবনের সঙ্গে। তবে নিজের পা হারানো নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন মুঞ্জির। তার সব চিন্তা এখন পাঁচ বছরের ছেলে মুস্তাফার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ সিরিয়ায় যুদ্ধের সময় নির্গত স্নায়ু গ্যাসের কারণে জন্মগত রোগে হাত-পা ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেছে মুস্তাফা।

 

আলোকচিত্রী মেহমেত আসলানের ছবিতে দেখা গেছে, মুঞ্জির ক্রাচ ব্যবহার করে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে ছেলেকে দুই হাত দিয়ে শূন্যে ধরে রেখেছেন। এ সময় বাবা-ছেলে দুই জনেই হাসছেন। সিরিয়ার ইদলিবের একটি বাজার দিয়ে যাওয়ার সময় বোমা বিস্ফোরণে ডান পা হারান মুঞ্জির।

তুরস্কের আলোকচিত্রী মেহমেত আসলান। ছবি : সংগৃহীত


আলোকচিত্রী মেহমেত ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, এই ছবির মাধ্যমে বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। আমি তাদের জীবনযুদ্ধকে সবার সামনে তুলে ধরেছি। আশাকরি সবাই শরণার্থীদের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবে। সবাই শিশুটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

 

তিনি আরো বলেন, আমি সিরিয়া সীমান্তের কাছে দক্ষিণ তুরস্কে এই পরিবারের সঙ্গে দেখা করি। সেখানে একটি দোকানে তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন মুঞ্জির আল-নাজ্জাল। তারা আমার সঙ্গে দেখা করে সাহায্য চান। তারা জানান, মুস্তাফার চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু, সেই চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল, যা তাদের জন্য বহন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া কৃত্রিম যন্ত্রও খুঁজে পাচ্ছি না।

 

মুঞ্জির বলেন, আমি বারবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে গিয়েছি। এমন কোনো শহর নেই যেখানে আমি খোঁজ নেইনি। কিন্তু, এখানের কোথাও কৃত্রিম যন্ত্রগুলো খুঁজে পাইনি।

Manual7 Ad Code

 

জন্মগত রোগ টেট্রা-অ্যামেলিয়া নিয়ে জন্ম নেয়া পাঁচ বছর বয়সী মুস্তাফা তখন কার্পেটে গড়াগড়ি করছিল ও হাসছিল। আর তার ছোট বোন তাকে বারবার একটি সোফায় বসিয়ে দিচ্ছিল ও খেলা করছিল। এ সময় মুস্তাফার বাবা বলেন, এভাবেই তার সময় কাটে। তবে সে খুবই স্মার্ট।

Manual2 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

ফটোগ্রাফার আসলানের বিশ্বাস- এই ছবিটি শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সমালোচনা কিংবা প্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করবে। কারণ বিরোধীরা সবসময় শরণার্থীদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য তাদের দায়ী করে আসছে।

 

মুস্তাফার মা জয়নব বলেন, শুনেছি ছবিটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করেছি মুস্তাফাকে আরও ভালো জীবন দেওয়ার। মানুষের সাহায্য পেতে চেষ্টা করেছি। কেই যদি আমাদের সহযোগিতা করে তাহলেই আমরা খুশি।

 

এই পুরষ্কারের অন্যতম বিচারক ফটোসাংবাদিক ব্রিটা জাচিনস্ক বলেন, আমি আমার জীবনে অনেক ছবি তুলেছি। অনেক দৃশ্য সামনে থেকে দেখেছি। কিন্তু এটি একটি ভিন্ন ছবি।এই ছবিটি আমাকে আলোড়িত করেছে। এখানে শুধু একটি পরিবার নয় যেন সব শরণার্থীদের কষ্টের ভয়াবহতা উঠে এসেছে বলেও জানান ব্রিটা জাচিনস্কব্রিটা জাচিনস্ক।

 

বিশ্বের নানা প্রান্তের ফটোগ্রাফারদের পাঠানো ফটোর মধ্যে থেকে এই ছবিটিকে সেরা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন বিচারকরা। মোট ১২টি বিভাগে প্রতিযোগিতা হয়েছিল। যার মধ্যে কোভিড-১৯ নামে একটি বিভাগও ছিল। ১৬৩টি দেশের হাজারের বেশি ফটোগ্রাফার ছবি পাঠিয়েছিলেন। তার মধ্যে থেকে ১২টি ছবিকে বেছে নেয়া হয়। সেই ১২টি ছবির মধ্যে সেরা মেহমেটের ছবি। পুরস্কার স্বরূপ তিনি পাবেন প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code