আবার এসেছে ফিরে, নবরূপে পহেলা বৈশাখ

প্রকাশিত: ৮:৩৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০১৭

আবার এসেছে ফিরে, নবরূপে পহেলা বৈশাখ

Manual3 Ad Code

জুবায়ের মাহমুদ, অতিথি :: আগামীকাল শুক্রবার (১৪ই এপ্রিল) পালিত হতে যাচ্ছে বাঙ্গালীদের সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ-১৪২৪ বাংলা। ১৪২৩ কে বিদায় জানিয়ে  নতুন প্রাণের উচ্ছাস নিয়ে যখন আসছে ১৪২৪, তখন বাঙ্গালিরা বর্ষবরণের জন্য হাতে নিয়েছে নানা আয়োজন। বাঙ্গালিরা তাদের প্রাণের এই উৎসবে পুরাতনের গ্লানি মুছে দিয়ে তাদের কৃষ্টি ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করে আবহমান সংস্কৃতির ধারায়।
এরই ধারাবাহিকতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা বৈশাখকে ঘিরে তাদের নানা আয়োজন ও বৈশাখ সম্পর্কে তাদের নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশ ও স্মৃতিচারণ করেন।

ক্যাম্পাস জীবনে বৈশাখের অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী আরিফ মাহমুদ শাওন বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব। এই দিনটা সব বাঙালী অনেক আয়োজন করে উদযাপন করে। সিলেটের সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর পহেলা বৈশাখ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে উদযাপন করেছি। এই দিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন মানুষের ধলে মুখর থাকে। আমরা সাংস্কৃতিক কর্মীরা সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। সারাদিন আড্ডা, গান-বাজনা, বিভিন্ন রকম আনন্দ করে পার করি। সবচেয়ে ভাল লাগার বিষয় হলো পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন রঙিন সাজে সজ্জিত থাকে। এবার ১৪২৫ বঙ্গাব্দে একটাই প্রত্যাশা বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক এবং অসহিংস রাষ্ট্র হিসাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।’

গণিত ভিাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজুল আবেদীন বৈশাখের স্মৃতি সম্পর্কে বলেন, ‘অদ্ভুত মানুষগুলো কতভাবেই না দিনটাকে রঙ্গিন করতে চাইছে। রঙ্গিন শাড়ি, রঙ্গিন চুড়ি, রঙ্গিন পোশাক, মাথায় ফুলের ব্যান্ড আরো কত কি। এই বিশেষ দিনটা উদযাপন এর আরো কত প্রস্তুতি। সকাল থেকে বন্ধুদের সাথে বা প্রিয়জনের সাথে বেড়াতে যাওয়া, ঘোরাঘুরি, আড্ডা আর সেলফি তোলা। কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রায় হাজির হওয়া।
কিন্তু একটা সময় এই সেলফি ছিলো না। পহেলা বৈশাখ মানে সকালে মায়ের হাতের পায়েশ। পরিবারের সাথে কিছু সময় পার করা। আর নতুন বছরে নতুন কিছু করার প্রতিজ্ঞা করা। আবার সন্ধ্যায় শুরু হতো হালখাতা। বকেয়া পরিশোধ করে একটু মিষ্টিমুখ করা। এগুলোই ছিলো বাঙ্গালীর প্রাণের ঐতিহ্য।’

Manual3 Ad Code

লোক প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দ্বীপ রায়ের কাছে পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসিমুখে কবিতা দিয়েই শুরু করলেন তিনি,

‘আজ বৈশাখের রঙের মেলায় আমার নিমন্ত্রণ

আজ ধন্য বড় ধন্য আমার ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবন ৷

Manual2 Ad Code

প্রকৃতির পালাবদলের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সামনে আবারও হাজির হয়েছে পহেলা বৈশাখ, বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব।পহেলা  বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে নতুন বছরকে বরণ কওে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ-কষ্ট। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। এই দিন নিজের সংস্কৃতিকে লালন করতে সারা বাঙ্গালি তথা সারা বাংলাদেশীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।’

অপরদিকে একই বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী হযরত আলি পহেলা বৈশাখের স্মৃতিচারণা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,‘ ১৪২৪। আসছে আরো একটি নতুন বছর। নতুন প্রত্যাশা। নতুনভাবে বেঁচে থাকা।

আজকে পেছনে ফিরে যখন পহেলা বৈশাখের স্মৃতি হাতরাই তখন নতুন জামা, গ্রামের মেলা, মেলায় বিচিত্র সব রঙ্গিন জিনিসপত্র কেনা, দেখাই মনে পড়ে। মনে পড়ে, এক উৎসবমুখর এক দিনের কথা। সবার বিচিত্র সব লাল-সাদা পোশাক, দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়ার কথাই মনে পড়ে। মেলায় নাগরদোলা, একতারার প্রতি কি ঝোকটাই না ছিলো তখন। আরো মনে পড়ে,  বাবার ইলিশ হাতে বাড়ি ফেরা, নদী থেকে ফিরে সেই পান্তা-ইলিশ খাবার তাড়া আরো কত্ত কি!  এখনো সেই পহেলা বৈশাখ দেখি। যেহেতু পেছনে ফেলে এসেছি শৈশব, এখন পহেলা বৈশাখ মানে আরো বড়ো কিছু। বিস্তৃত কিছু।

এটি শুধুমাত্র একটি উৎসবমুখর দিনই না। এটি বাঙ্গালীর পরিচয়ের বাহকও। নতুন বছরের একটি দিনই না, এখানে মিশে আছে বাঙ্গালীর আবেগ, চিন্তাচেতনা। বাঙ্গালী জাতিসত্তার অগ্রবাহকও এই পহেলা বৈশাখ। সব বাঙ্গালী আজ বুঝতে পারি, অনুভূত হই এই একটি দিনে। নতুন পঞ্জিকার সাথে এটি যে আমাদের নিজেদেরকে জানারও দিন সেটিও উপলদ্ধি হয়। সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আজ সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করি, যে সংস্কৃতি বাঙ্গালীর সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে একই পোশাকে যখন মিলিত হই, তখন অনুভূত হয়, আমরা সবাই একই জাতিসত্তারই অংশ। তাই উৎসবমুখর দিনের সাথেও এটি হয়ে উঠে অনন্য। আমার জন্য। আমাদের জন্য।’

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ও আবৃত্তি শিল্পী অনামিকা কৈরী বিশ^বিদ্যালয় জীবনের বৈশাখের উদযাপনের ভিন্নতা তুলে ধরেন তার বক্তব্যে, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রানের উৎসব, এই দিনটার জন্য সকল বয়সের মানুষের একটা অপেক্ষা থেকে যায়, চলতে থাকে প্রস্তুতি।

Manual4 Ad Code

পহেলা বৈশাখ পালনে, ছেলেবেলা আর এখনের অনেকখানি তফাৎ আছে বলা যায়।আগে পরিবারের সবার সাথেই কাটত দিনটা, নতুন জামা, বাঙালিয়ানা খাবার ইলিশ, ভর্তা, মিষ্টি, দই সবই থাকতো, শুধু বাইরে ঘুরতে যাওয়া তেমন একটা হতো না। কিন্তু ক্যাম্পাসে আসার পর পহেলা বৈশাখের  সংজ্ঞা বদলে গেলো, এখানে সকাল শুরু হয় বর্ণিল র‌্যালির মধ্যদিয়ে। সারাদিন কাটে সংগঠনের ট্যান্টে চিৎকার করে গান গেয়ে, বন্ধু আর সিনিয়র ভাইয়া আপুদের সাথে ঘুরাঘুরি আর খাওয়া দাওয়ার মাধ্যমে। ক্যাম্পাসের এমন বর্ণিল সাজ আর এত এত মানুষের মিলন মেলা সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। এই দিনটার শুরু হয় রঙের আভা দিয়ে, সারাবছর যেনো এমনি রঙিন কাটে সেই প্রত্যাশা থাকে সবার। রঙিন কাটুক নববর্ষ, শুভ নববর্ষ ১৪২৪।’

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একই বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল রহমান পাভেল অনেকটা সাহিত্যিক ভাষায় পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ পহেলা বৈশাখ মানে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখ মানে নিজেকে এবং নিজ জাতির ঐতিহ্যকে পৃথিবীর বুকে ফুটিয়ে তোলা। পহেরা বৈশাখ মানে সকালে ঘুম থেকে উঠা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কারুকার্য, ঐতিহ্যবাহী রান্নাবান্না, রমণীদের লাল সাদা শাড়ি, ছেলেদের ফতুয়া পাঞ্জাবি। পহেলা বৈশাখ মানে রং বেরঙ্গের আল্পনা, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া। পহেলা বৈশাখ মানে বাঙ্গালীর চেতনা পাখি যে বসে আছে সবুজ অরণ্যের ডালে। যার মাথার উপরে দোলে বন্য পানলতা, যার নখের রং লাল।’

Manual6 Ad Code

বিশ^বিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের আব্দুল্লাহ আল মাহিন ১৪২৪ নববর্ষ নিয়ে নতুন কিছু আশা করছেন, ‘ ১৪২৪ বাংলা নববর্ষ আমার জন্য একটু অন্যরকম হবে আশা করছি। কারন এই বছরই আমি বিশ^বিদ্যালয়ে পদার্পণ করেছি। আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ১৪২৩ নববর্ষ আমি আমার পরিবারের সাথে পালন করেছি। মায়ের হাতের পিঠাপুলি, পান্তা-ইলিশ প্রভৃতির মুখরোচক স্বাদ অনুভব করেছি। কিন্তু এখন তা আর সম্ভব নয়। এখন নতুন এক পরিবেশে নতুন বন্ধুদের সাথে আনন্দ ফূর্তি করে পহেলা বৈশাখ কাটাব। পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়া পহেলা বৈশাখ অপূর্ণ রয়ে যায়। অতএব দিনের শুরুটা হবে এগলো দিয়েই।’

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code