মাদ্রাসা শিক্ষকের ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা সেই শিশু এখন সিলেটের ‘সেফ হোমে’

প্রকাশিত: ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ, মে ১৫, ২০২৬

মাদ্রাসা শিক্ষকের ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা সেই শিশু এখন সিলেটের ‘সেফ হোমে’

Manual1 Ad Code

মেইল ডেস্ক:
নেত্রকোণায় ধর্ষণের শিকার ১২ বছরের অন্তঃসত্ত্বা সেই শিশুকে নিরাপত্তা ও চিকিৎসার জন্য সিলেটের একটি নিরাপদ আশ্রয়ে (সেফ হোম) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বর্তমানে শিশুটি সেখানেই আছে। ২৭ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এই শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার মায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেওয়া হয়।

 

সংশ্লিষ্ট জিআরও সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মে (মঙ্গলবার) বিকেলে শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে হেফাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। মেয়ে এবং তার মা দুইজন এসে নিরাপত্তা চেয়ে বিচারকের কাছে আবেদন করেছিলেন।

Manual4 Ad Code

 

শিশুটির মা বলেন, আমরা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত ছিলাম। তাই আবেদন করেছি। আদালত তাকে একটি নিরাপদ জায়গায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ওইদিন রাতেই পুলিশের মাধ্যমে আমার মেয়েকে সিলেটে পাঠানো হয়েছে। এখন আমরা কিছুটা নিরাপদ মনে করছি।

 

গত ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় মদন থানায় মেয়েটির মা মাদরাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে অভিযুক্ত করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে।

 

মামলা দায়ের করার পর প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য নেত্রকোণা সদর হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠানো হলে নেত্রকোণা সদর হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ মেডিকেল অফিসার ডা. জান্নাতু আদনীন তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

 

তিনি বলেন, আমাদের কাছে যখন সে আসে তখন তার ২৭ সপ্তাহর কিছু বেশি চলছে। তার জন্য তো এটা আসলেই কষ্টকর। তার ডেলিভারির সময়টা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখন তার জন্য বাচ্চা নষ্ট করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ, আবার বাচ্চা জন্ম দেওয়াটাও ঝুঁকিপূর্ণ। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে যাওয়ার পর ট্রিটমেন্ট পারপাসে আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। সে খুব সম্ভবত মদনে আবার একজন ডাক্তার দেখিয়েছে।

 

Manual7 Ad Code

আসামি আমান উল্লাহ সাগরকে ৭ মে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোসসিনা ইসলাম তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিন দিনের রিমান্ড শেষে ১০ মে বিকেলে চাঞ্চল্যকর এই মামলার আসামিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আখতারুজ্জামান আসামির ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করলে আদালত আসামির ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন।

 

১১ মে দুপুরে বিশেষ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ধর্ষণের শিকার শিশুটির বাড়িতে যান। আসকের লিগ্যাল এইড সার্ভিসের সিনিয়র স্টাফ আইনজীবী সেলিনা আক্তার ও ইনভেস্টিগেটর তাওহীদ আহমেদ রানা শিশুটির বাড়ি ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

 

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রবেশন অফিসার মো. রফিক উদ্দিন বলেন, জেলার লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সিনিয়র সরকারি জজ মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলামের সহায়তায় শিশুটিকে একটা নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার ঝুঁকির একটা ব্যাপার আছে তো। আইনি সহায়তা থেকে শুরু করে তার চিকিৎসার বিষয়টাকে প্রায়োরিটি দেওয়া হয়েছে।

 

নেত্রকোণা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, কোর্ট থেকে প্রবেশন অফিসারকে ডেকেছে। যেহেতু নেত্রকোণায় আমাদের শিশুটিকে রাখার মতো উপযুক্ত পরিবেশ নেই, তাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাকে নিরাপদ কোনো স্থানে রাখতে হবে। প্রথমে ফরিদপুর এবং পরে সিলেটের কথা আলোচনা হয়েছে। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সবকিছু বিবেচনা করে সিলেটে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ওই রাতেই শিশুটিকে সিলেটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

Manual8 Ad Code

মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, কোর্টের আদেশে ওকে সিলেটের সেফ হোমে পাঠানো হয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিসার, সমাজসেবা অফিসার ওনারাই যোগাযোগ করছেন। এখন ওই সেফ হোমেই থাকবে সে। যেহেতু ওর মা সিলেটে কাজ করে। ওর মায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোর্ট এই অনুমতি দিছে।

 

সিলেট বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সুচিত্রা রায় বলেন, আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে আমাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা তার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। এখানে তাকে কেবল আবাসনই নয়, বরং তার মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং এবং তার আইনি সহায়তার প্রক্রিয়াও তদারকি করা হবে। যেহেতু শিশুটি একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে ও যাচ্ছে, তাকে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।

 

সুরক্ষা বঞ্চিত মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সিলেটের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক নুসরাত-এ-ইলাহী বলেন, মেয়েটি গত পরশুদিন ভোর ৫টায় আমাদের এখানে এসেছে। বাচ্চাটাকে নিয়ে আমরাও টেনশনে আছি। অথরিটির সঙ্গে কথা বলেছি, সে তো নিজেই বাচ্চা। এর মধ্যে প্রেগনেন্ট এটা তো টেনশনের বিষয়। আমরা আলাদাভাবে ডাক্তারের কাছে পাঠাব চেকআপের জন্য। প্রতিষ্ঠানে সরকারের বিধি অনুযায়ী যে সুযোগ-সুবিধা তাকে দেওয়ার কথা রয়েছে তার সর্বোচ্চটাই দেওয়া হবে।

 

নুসরাত আরও বলেন, আমাদের কাউন্সিলর আছে। একটি এনজিও আছে যারা তাকে কাউন্সেলিং করে সপ্তাহে দুই দিন। আমি বলেছি, ওকে যেন স্পেশালি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একটু বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। আর ডাক্তারের চেকআপ বিষয়টাও আমার যথাসম্ভব করাব।

Manual2 Ad Code

 

প্রসঙ্গত, উপজেলার একটি মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরের বিরুদ্ধে ওই ছাত্রীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ সময় বিষয়টি গোপন থাকলেও পরবর্তীতে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ঘটনাটি জানাজানি হয়। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে ভুক্তভোগীর পরিবার থানায় মামলা দায়ের করে।

 

(সুরমামেইল/এফএ)


সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code