সোশ্যাল মিডিয়ায় এটম বোমা ফাটলো!

প্রকাশিত: ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৯, ২০১৯

সোশ্যাল মিডিয়ায় এটম বোমা ফাটলো!

Manual6 Ad Code

মনে হচ্ছে এপ্রিলের ৪ তারিখ থেকে সিরিজ বোমা হামলা আর তার কাউন্টার বোমা হামলার খবর দুনিয়া জুড়ে মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে! এ যে মেয়েদের, মায়েদের জন্য আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের মত আন্দোলন। কয়েকটি শব্দের একটা একটা বাক্য যেন এটম বোমার মতই শক্তিশালী। ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা গেঞ্জি পরা কয়েকটি মেয়ের ছবিতে যারা ‘শরীরের ভাজ খুঁজছিল’, তাদের দশা খুব যা ভালো না, তার খবর সোশ্যাল মিডিয়া পেরিয়ে প্রিন্ট ও এলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া তথা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

একজন মেয়ের বাবা হিসেবে আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৭ তারিখে টেলিফোনে দীর্ঘ কথা বলি নিশা নামের সেই মেয়েটির সাথে। পেশায় সে শিল্পী, আমার মেয়ের বয়সী। সে আমাদের মতই কারো মেয়ে বা কারো বোন হবে। এই নিশা একদিন গণপরিবহণে একজন বয়স্ক পুরুষ দ্বারা চরমভাবেই লাঞ্ছিত হয়। গাড়ির অন্যলোকদের বলেও তার কোন প্রতিকার পায়নি নিশা। বয়সের বর্ম আর পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা চেতনায় নিশাকে মিথ্যাবাদী করে ছাড়ে ঐ বাসে। এটা তার কাছে হয়ে যায় একটা ট্রমার মত। তাই সে ভুলতে পারেনি। সে তাই নারীদের এমন ভোগান্তির বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সামাজিক মাধ্যমে একটি ক্যাম্পেইন শুরু করে। প্রথমে একটা গয়নায় কিছু ম্যাসেজ দেয় সে। সেটা অতটা আলচনায় আসেনি সেবার। কিন্তু এবার সে একটি অনলাইন শপিং প্লাটফর্ম “BJNS’ – বিজেন্স” এর সাহায্য নেয়। গত ৩ এপ্রিল রাত ০৯টা ৫৩ মিনিটে “BJNS’ – বিজেন্স” এর ফেসবুক পেইজে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ স্লোগান লেখা টি-শার্ট গায়ে নারীদের জনপরিসরে বিচরণের ১২টি মডেলিং ছবি আপলোড করা হয়।

Manual3 Ad Code

এর আগে পোস্টে বলা হয়– বাসে,  রাস্তায় নিজের সাথে হওয়া অনাকাঙ্খিত ঘটনার প্রতিবাদ,  ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলাম ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’  লেখনি দিয়ে খোঁপার কাঁটায়। এবার এলো তা টি-শার্ট এ। এই টি-শার্ট পরলেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো বন্ধ হয়ে যাবেনা৷ আমাদের সোচ্চার আওয়াজ-ই পারে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো নির্মূল করতে। টি-শার্ট এর ভাবনাটা আসে শুভর কাছ থেকে যার নকশাকার নিশা। এতে সহযোগিতা করেন আহসান। আর ছবি তুলতে সহায়তা করায় তাঁরা কৃতজ্ঞ বিহঙ্গ বাস কর্তৃপক্ষের কাছে। এই টি-শার্ট পরা মেয়েদের ছবি তুলেছেন সাতবি।

Manual3 Ad Code

সেখানে আপলোড করা ছবিগুলো থেকে কয়েকটিকে এডিট করে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ এর স্থলে অশ্লীল কিছু বাক্য যুক্ত করে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়। এবং মূল ছবিগুলোর মতো ভুয়া ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে সেই অশ্লীল বাক্যযুক্ত ছবিগুলোকে ‘সত্য’ বলে ধরে নিয়েছেন এবং এমন কার্যকলাপের সমালোচনা করছেন।

অবশ্য খুবই সাধারণ একটি স্লোগানকে বিকৃত করে নোংরা বাক্য জুড়ে দিয়ে প্রচার চালানো থেকেই বুঝা যায় যে, অযাচিতভাবে নারীর ‘গা ঘেঁষে দাঁড়ানোতে’ মানা করায় অনেকের আপত্তি রয়েছে। আপত্তি না থাকলে এমন সাধারণ একটি বাক্য নিয়ে নোংরা প্রচারণার প্রয়োজনই ছিলোনা।

Manual2 Ad Code

আমি ফেসবুকে অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি যে, দল মত নির্বিশেষে বহু তথাকথিত প্রগতিশীল মানুষ ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় একটা প্রগতিশীল পত্রিকা মঞ্চের নেত্রী লাকিকে বেশ্যা বানানোর চেষ্টায় মত্ত হয়েছিলো, কিছুটা সফলও হয়েছিলো, কত টাকার লোভে আমার জানা নেই।

তবে, এবার আমি কিছুটা অবাক তো হয়েছি কারণ এদের অনেককেই আমি মানুষ মনে করতাম, অন্তত তাদের কথায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের আচরণে, কার্যক্রমে। কিন্তু আসলে তারা মানুষের চামড়া পরা অন্য কিছুই হবে হয়তো। আমি জানি (অবশ্যই কামনা করি না) এদের কেউ না কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় বা জটিল কোন রোগে অসময়ে মারা যাবে তাদের স্ত্রী আর শিশু কন্যা রেখে। এর পরে, তাদের স্ত্রীরা অনেকেই গণপরিবহণে জীবিকার জন্য ভ্রমন করবেন এবং চরম নির্যাতনের শিকার হবেন যা সে বর্তমানে প্রত্যাশা করছে। এসব কথিত প্রগতিশীল আর পরকালে বিশ্বাসীরা তখন বেহেস্তে গেলমান নিয়ে ফুর্তি করার সময় কী করবে এসব দেখে! কী করবে যখন দেখবে গণপরিবহণে তার প্রাণের টুকরা মেয়েকে নিয়ে তার পশু বন্ধুর ছেলেরা পৈশাচিক উল্লাসে মেতে আছে, আর তার মেয়ের দু’চোখ দিয়ে অঝোর দাহারায় ঝরছে নোনা জল, ভিজে যাচ্ছে শরীর, হতাশায় ভাঙ্গছে হৃদয়!

একই কথার বিভিন্ন অর্থ হয় বিভিন্ন জনের কাছে। বিভিন্ন জনের কাছে একই কথা বাজে ভিন্ন ভিন্ন সুরে। আসলে কোন কথা আমরা নিজেরা যেভাবে শুনতে চাই ঠিক সেভাবেই শুনি, যেভাবে তার অর্থ বানাতে চাই সেভাবেই বানাই। রাস্তায় বিশেষ করে জনপরিসরে বা জণপরিবহণে চলাচলে নারীর কতটা নিরাপত্তাহীন তা নিয়ে বাবা ভাই বন্ধুদের সচেতনতায় একটু স্টিমুলেট করতে মূলত; উদ্যোগ ছিল, অন্য কিছু না। কিন্তু মানসিকভাবে অসুস্থ কিছু মানুষ মেয়েদের ‘গা ঘেঁষে দাঁড়ানো বা কোন নারীকে মানসিকভাবে নির্যাতনের চেষ্টায়’ ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ স্লোগান লেখা টি-শার্ট গায়ে নারীদের নিয়ে নানা বাজে আর চরম নোংরা মন্তব্য করছে। জানি না নিজের আর নিজের উত্তরসূরিদের মঙ্গলের কথা কবে থেকে ভাববো আমরা। আমার মাথায় আসেনা এর জবাব। আমরা কেন নিজের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যার জন্য কবর খুঁড়ছি!!

Manual2 Ad Code

লেখক : সায়েদুল আরেফিন, উন্নয়ন কর্মী ও কলামিষ্ট।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code