ধারাবাহিক উপন্যাস : ভবঘুরে ( ৩য় পর্ব)

প্রকাশিত: ৪:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০১৬

ধারাবাহিক উপন্যাস : ভবঘুরে ( ৩য় পর্ব)

Manual6 Ad Code

part-3-img……. উপন্যাস : ভবঘুরে

আহসান আহসানুল হাবিব……..

বাসে করে যাচ্ছি হাওয়া খেতে । যন্ত্র মানুষের এ শহরে বেচে থাকতে হলে মাঝে মাঝে হাওয়া খেতে বিকালে বের হতে হয়।

Manual6 Ad Code

“ঢাকায় সুন্দরীদের খ্যাতি প্রজাপতি হয়ে উড়ে বহু ঠোঁটে,

লস্যময়ী রমণীরা সোন্দর্যের উগ্র ঢেউ তুলে কূটনৈতিক পার্টিতে

কিংবা ফ্যাশোন শো এর ঝলমলে হল ঘরে প্রায়শই।

শামসুর রহমানের প্রেমের পদাবলীর পঙক্তিগুলো  চোখে পড়ছে আজকাল। বাসে , রিক্সায়  এই শহরের অভিজাত পাড়া দিয়ে হেটে গেলে  মনে হয় আমরা অতি আধুনিক হয়ে গেছি। আধুনিকতার ছোঁয়া এখন দেহে,  দেহের ভাজে থেকে  কাপড়ে। একদল উচ্ছ্বল তরুণী আছে যারা অনেকটা শরীর দেখিয়ে হাটতে ভালোবাসে। শরীর থেকে যৌনতার ঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয় ভিড়ের মধ্যে বাস স্টপেজে। সেই সব তরূনীরা  ভালোবাসে পুরুষের লোলুপ  দৃষ্টিকে। পুরুষের চোখের লোলুপ অনল তাদের মনে দেয় এক পাশবিক প্রশান্তি। আরেক দল বোরখাকে নতুন ভাবে পরিচিত করছে সম্পূর্ণ তাদের মতো করে। শরীর ঢেকে রাখার পোষাক বোরখায় তারা ফুটিয়ে তুলে দেহের ভাজ, মাংসের স্তূপ,  চামড়ায় জমে থাকা মেদ , মাথার হিজাবে ফ্যাশন। এসব শুভ্র চামড়ার বক গুলোকে ছো মেরে নিতে চায় কিছু শকুন। কিছু কাক বিদ্যুতের তারে বসে চোখ ধর্ষণে নিভৃত করে মনের কাম; রমনীর  শরীরে, খুব গোপনে । পৃথিবীতে মানুষ দুটি পূজাই করছে । যার একটি ‘পেট পূজা’ অন্যটি ‘দেহ’।

“মামা যাইবেন কই ?ভাড়া হইছে ?”

“হাউজ বিল্ডিং। ভাড়া হয় নি মামা।“

“লন ভাড়াটা।”

“আজকে যে পকেটে ভাড়া নেই মামা।“

আমার চুল থেকে পায়ের স্যন্ডেল পর্যন্ত হেলপার সাহেব চোখ বুলালেন। তার চোখের ভ্রু কিঞ্চিত উপরে উঠে গেছে, কপালে কয়েকটা ভাজ। তার মাথার ভিতর  ঘুরছে- এমন ভদ্র  জামার পকেট টাকাহীন হয়  কিভাবে  ? পোষাক দিয়ে নারীরা জানান দেয় তার দেহ আর পুরুষ জানান দেয় তার প্রতিপত্বি।   টাকাহীন সুন্দর জামার পকেটের  সমীকরণ হেলপারের মগজে এমন ধাঁধার সৃষ্টি করেছে যে তার মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে। হঠাৎ করে তার ধ্যান কাটলো  ছোট্ট হাসিতে-

“ঠিক আছে মামা আরেকদিন দিয়েন ।  “

 কথাটা বলার সময় নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল এই ছোকড়া। কেন জানি আমার চোখে চোখ রেখে বলার ক্ষমতা হয় নি। নিম্নবিত্ত কখনো মধ্যবিত্তের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতে পারে না।  চোখটা দেখতে পারলে হয়তো তার ধ্যানের রিসার্চ পেপারগুলো পড়তে পারতাম । ভাড়া হয়নি স্বীকার করার পর, পকেটে  ভাড়া নেই বলাটা তাকে বেশ অবাক করেছে । আমি ছোট একটি মিথ্যা বলার সুযোগ হাতছাড়া করায় সে  বিস্মিত । অথবা সত্য বলায় ভাড়াটা আরেকদিনের খাতায় চলে গেল । এই শহরে আজকাল  বাসে পাচ দশ টাকা ভাড়া চুরি করে কিছুলোক । কেউ আবার পাচ দশ টাকার জন্যে হেলপারে গায়ে হাত তোলে। এই ছোট খোট মারামারির কোন  মামলা নেই, বিচার নেই। নিম্নবিত্ত মার খায় মধ্যবিত্তের হাতে । আর  মার খায়ে প্রতিবাদ করে না  বলে সে ছোটলোক।

আমার পিছনের সিটে এক বুড়া খোকা বসেছে ।  তার ভাড়া নিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ হচ্ছে । আমি খুব মন দিয়ে শুনছি । পাবলিক বাসে প্নেক নাটক দেখা যায় । জীবন্ত নাটক ।

“পাচ টাকায় হবে না মামা ,পনের টাকা দেন ।“

“স্টুডেন্ট।“

“স্টুডেন্ট বইল্যাই ১৫  টাকা দিবেন। হাফ ভাড়া।“

“ফাইজলামি চোদাও মিয়া। ঢাকা শহরের এই মাথা থেকে ঐ মাথা ,সব জায়গাতেই স্টুডেন্ট ভাড়া ৫ টাকা। রেগুলার দিয়া আসি।“

“ আমার সিট খাইয়া যাইবেন আবার হাফও দিবেন নাহ?”

“সিট খাইয়া যাই মানে ?আমি প্রতিবন্ধী। বাসে প্রতিবন্ধীর জন্যে নির্ধারিত সিট আছে।“

“আইচ্ছা, দেন আরো ১০  টাকা।“

“না  ,আর হবে না। আমি মুক্তিযোদ্ধা কোঠার , মুক্তিযোদ্ধার নাতি।“

“ত্রিশ টাকার ভাড়া হাফ পনের টাকাতো দিবেন।  আচ্ছা দেন,  আরো পাচ টাকা দেন।“

 “একটা  পয়সাও আর  দিমু না। আমি রাজাকার।“

বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্র নেতারা  ছাত্রত্ব শেষে  চাকুরী জীবনে ঢুকলেও তারা ছাত্র  রয়ে যান। পাঠ্য পুস্তকের পাঠ চুকালনো শেষ হইয়েছে  বটে, তবে  তারা রাজনীতির বিদ্যালয়ে তখনো ছাত্র। তারা “নেতার” ছাত্র। ছাত্রত্বহীন আরেকদল ছাত্র আছে এ শহরে।  এরা শুধু পাবিলক বাসেই ছাত্র। এই পাবলিক বাসকে কেন্দ্র করে আরেক শ্রেণীর চোরের পেটে ভাত জোটে। এরা অতি ডিজিটালাইজড চোর । সংখ্যায় থাকে পাচ ছয় জন । প্রথম চোরের দায়িত্ব পকেট থেকে মোবাইল মানি ব্যাগ বের করে এনে সাথে সাথে দ্বিতীয় জনকে দিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় তৃতীয় হয়ে এভাবেই বাসের মধ্যেই কয়েক হাত বদল হয়ে যায়। কারো হাতের স্পর্শ  উরু কিংবা নিতম্ব দেশে অনুভব করলে তার হাত চেপে ধরে চোর বলার আগেই মাল চলে যায় অন্য চোরের হাতে। যার হাত চেপে ধরা হলো প্রমাণের  অভাবে  সে নির্দোষ। পরবর্তী স্টপেজে বাস থামার সাথে সাথে যাত্রীর ছদ্মবেশী এই চোররা নেমে যায় যাত্রীর বেশেই।

এতো ভিড় আর জ্যাম ঠেলে চলন্ত বাসে উঠা, দরজায় ঝুলা , ছাদে চড়া এক প্রকার ব্যায়াম  হিসেবেই  নিয়ে নিয়েছে এই ব্যাস্ত নগরীর মানুষ। ঢাকায় অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে  উঠা কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ডের কারনে বিল্ডিং গুলোই চোখে পড়ে না । ফার্মগেইট দেশের কোচিংয়ের রাজধানী।  এখানে প্রাইমারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় , চাকুরী , বিসিএস , বিদেশ যাওয়ার জন্যে ভাষা শিক্ষা  থেকে রান্না শিক্ষা কি না শিখানো হয় ? কয়দিন পরে বিয়ে করার প্রস্তুতি থেকে সন্তান নেওয়ার প্রক্রিয়া এমনকি বাসে উঠার কোচিংও চালু হবে । কোচিং বাণিজ্যে ছেয়ে গেছে দেশ।

আমার এক বিশিষ্ট কোচিং বিষেশজ্ঞ বন্ধু আছে। নাম শাফায়েত। ব্রাইট স্টুডেন্ট। পড়াতে পড়াতে মাথার চুল উড়ে গেছে। ফার্মগেটে সে শাফায়েত স্যার নামে পরিচিত। মাসে এখন প্রায় দুই লাখ টাকা রোজগার ছাত্র পড়িয়ে। শেষবার শাফায়েত এর সাথে দেখা হইয়েছিল একটি বিদেশি পেট্রোলিয়াম কোম্পানির চাকুরীর ইন্টারভিউতে। চাকুরীর ইন্টারভিউ গুলোতে আলতু ফালতু প্রশ্ন করলে বুঝতে হবে মামা চাচার জোরে লোক নিয়োগ হয়ে গেছে। এইসব আলতু ফালতু প্রশ্নের উত্তরও দিতে  হয় আলতু ফালতু , প্রশ্নকর্তাদের একটু বিভ্রান্তিকর অবস্থায় ফেলা যায়। শাফায়েত আর আমার এ ব্যাপারে মিল ছিল ভীষণ-

 ভাইভা বোর্ডে ৩ জন ভদ্র পোশাকী লোক বসেছিলেন –

“ম্যা আই কামিং স্যার”

“ইয়েসে কামিং ,প্লিজ হেভ ইউর সিট”

“থ্যাংক ইউ স্যার”

“আপনার নাম ?”

“নামতো ফাইলে লেখা আছে স্যার।”

“আপনার কি নিজের নাম মুখে বলতে সমস্যা?”

“জ্বী না স্যার ,কোন সমস্যা নেই । তবে ছোট বেলায় সময়ের মূল্য রচনা পড়েছি। আপনার সময় বাচানোর চেষ্টা করছি। আমার নাম  “সাগর।“

“সার্টিফিকেটেতো শাফায়েত হোসেন লিখা!”

“যেটা সার্টিফিকেটে লেখা নেই, আপনি জানেনা না  সেটাই বললাম । সার্টিফিকেটের নামতো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন স্যার।“

“অনার্স মাষ্টার্স দুই বারই সেকেন্ড ডিভিশন। এই রেজেল্টে কি চাকুরী হয়?”

“যদি নাই হয় তবে নিয়োগ বিজ্ঞপতিতে কেন দিয়েছেন স্যার?’’

ভাইবা বোর্ডে বসে থাকা অন্য একজন এবার চোখ মুখ শক্ত করে বললেন –

“প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন করাই কি আপনার অভ্যাস?”

“জ্বী না স্যার ,তবে কিছু প্রশ্নের উত্তরই হয় প্রশ্ন । জ্ঞানীরা সেটা ধরতে পারে , বোকারা পারে না ।“

 এবার তৃতীয় জন বেশ রেগে গিয়ে  – “বুঝতে পেরেছি, আপনি অনেক জ্ঞানী। দেখি, বলেনতো  একটা বাংলা মিশ্র শব্দ।“

“স্যার – মাদারচোদ।“

“কি ??”

“জ্বী স্যার ,মাদারচোদ।“

Manual2 Ad Code

“আপনি ফাজলামো করছেন !!!”

“একদম না স্যার। বাংলা ও ভিন্ন ভাষার শব্দের মিশ্রণে যে শব্দ গঠিত হয় তাই মিশ্র শব্দ। মাদার একটি ইংরেজি শব্দ আর চোদ  খাঁটি বাংলা।“

Manual3 Ad Code

 “আপনি আসতে পারেন।“

“জ্বী স্যার ,আজ আসি। সময় করে একদিন এসে কফি খেয়ে যাবো। আর আপনার প্রশ্নের উত্তরগুলো প্রশ্ন দিয়ে দিয়ে যাবো।“

এভাবে চোখে মুখে হাসি ফুটিয়ে হাসতে হাসতে শাফায়েত বারিয়ে এসেছিল সেদিন ভাইভা বোর্ড থেকে। একশতো তিন তম চাকরীর ইন্টারভিয়ের ভাইভা। আমার আর ভাইভার  মুখোমুখি হওয়া হয় নি। মানুষের কিছু ব্যর্থতা ধারাবাহিক কষ্ট দিতে দিতে এক সময় তাকে সুখ দেওয়া শুরু করে। সেদিন থেকেই বোধ মানুষ পূর্ণ স্বাধীন হতে পারে। আমরাতো হয়তো  হয়েগিয়েছিলাম সেদিন থেকে। সারা  বিকালটা কেটেছিল যে লেকের ধারে আজ সেই  লেকের ধারেই যাচ্ছি। বছর চারতো কেটে গেল। সারা বিকাল শাফায়েত কোন কথা বলে নি সেদিন। লেকের পাড়ের ঢালু জমিটায়  উদাস হয়ে বসেছিল হাতে ভর দিয়ে ,আকাশের দিয়ে মুখ করে। আমি ছিলাম ওর পাশেই , মাথার নিচে হাত রেখে ঢালু জায়গায় শরীর এলিয়ে  শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে। একদল উদাস বাতাস সঙ্গ দিয়েছিল।

“শাফায়েত”

“শাফায়েত”………… “ এই শাফায়েত”

“কিরে বেশী হয়ে গেল নাকি ?……। একদম চুপ”

অনেনেনেক দিন পর দোস্ত………

হুম । দেখ দেখে , আকাশ দেখ।

আকাশ খুব নীরব হয়ে দেখতে হয়। খুব মন দিয়ে । দেখতে দেখতে এক সময় আকাশের সাথে কথা কথা বলতে হয়। একা থাকলে শব্দ করে , অধিক থাকলে মনে মনে।

কত অভিযোগতো এক আকাশের কাছে দিয়েছি। কত দুঃখ বলেছি। আসমান তুমি কি শুধুই সবার দুঃখ শোন ?? আমাদের দুঃখ  শুনতে শুনতে তুমি কি নীল হয়ে গেছ ? তোমাকেতো আমি শুধু  নীল দেখি ঐ সুমুদ্রের ধারে। এখনতো ভালই আছি বেশ । আমার আকাশ আজ আসমানী হয়ে গেছে।

তুমিতো বিকালের লাল রক্তিমতায় গোধূলীর অহংকার। নিঃসঙ্গ রাতের চাঁদনীকে ঢেকে দেওয়া মেঘে মেঘে ভেসে ভেড়ানো দঃখ। তমাকে লেখা একটা চিঠি পকেটে পড়ে আছে বহুদিন ধরে । আজ দিয়ে দিবো –

“একদিন তুমি আমিও থাকবো না

ভেসে বেড়াবো রাতের আকাশের মেঘ হয়ে

স্থির তারার আলোয়

-পরজনমেও মিলন হবে প্রিয় –

যদি আর জনম নাই থাকে-

তবে, তুমি আমি ভেসে বেড়াবো অদৃশ্য হয়ে

বিদ্ধস্ত হওয়া এই পৃথিবীর আকাশে।“

-আমি

                    ২রা  চৈত্র ।

তমার চিঠি গুলো আমার পকেটে থাকে না , থাকে মনে । সারা জীবন মনে রাখিয়ে দেওয়ার জন্যে তমা বেশীর ভাগ চিঠি  লিখত ওর হাতে। হাতেই লিখে দেখাতো আমাকে ।  আর কাগজে বাংলায়  লিখা  চিঠির নিচে  নাম লিখতো  ইংরেজিতে। হাতে লেখা চিঠি গুলোতে কখনোই , কখনোই   থাকতো না  সিগনেচার।

“হাতে লেখা চিঠিতে সিগনেচার নেই কেন গাধী ,হুম ?”

Manual3 Ad Code

“হাতটাই তো আমার । নামের আর কি দরকার ?”

 ……..চলবে ……

সংবাদটি শেয়ার করুন
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code